• ...
ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৪৮ মিনিট আগে
ই-পেপার

ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতির বর্তমান সমস্যা ও কিছু কথা

হাকীম এম এ কালাম পাটোয়ারী
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বুধবার, ৯:২২
ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী এক জাতীয় সম্পদ। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ চিকিৎসাপদ্ধতি প্রধানত স্থানীয় গাছগাছড়ার ওপর নির্ভরশীল। মানুষ রোগ প্রতিরোধ ও রোগ যন্ত্রণার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রাচীনকাল থেকে ভেষজ উদ্ভিদের রসকষ, লতাপাতা, ছাল,শিকড়, ফুলফল ইত্যাদি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে আসছে।
বস্তুত ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আগেকার মনীষীদের রেখে যাওয়া নিরলস গবেষণার ফসল। জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা, পরিচর্যা ও বিশ্লেষণ করতেন। এ যাবৎ যত হাজার ভেষজ উদ্ভিদের কার্যকারিতা, প্রয়োগবিধি, ব্যবহার্য অংশ, স্বাদ, গন্ধ মাত্রাজ্ঞান, অপকারিতা প্রভৃতি সম্পর্কে আমরা কিঞ্চিৎ জ্ঞান লাভ করার সুযোগ পেয়েছি, এগুলো তাদেরই গবেষণার ফসল। উল্লেখ করা যেতে পারেÑ দারুচিনি, আদা, হলুদ, ধনিয়া, গোলমরিচ, আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, তুলসী, বাসক, থানকুনি প্রভৃতি ভেষজ উদ্ভিদের কার্যকারিতা ও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে আজো কোনো সূত্র না পেলে হয়তো এখনো মানবকল্যাণের কোনো কাজে লাগত না।
ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে পাস করা একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কৌশলতার পাশাপাশি রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত ভেষজ উদ্ভিদের পরিচিতি, কার্যকারিতা, মেজাজ (Temperament), সেবনমাত্রা, ব্যবহার্য অংশ এবং নির্বাচিত ভেষজ উদ্ভিদ সহযোগে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রেও সমানভাবে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। স্নাতক কিংবা ডিপ্লোমা কোর্সে চার-পাঁচ বছরে প্রায় ২৫-৩০টি বিষয়ে পড়াশোনা করতে হয়। শিক্ষা কারিকুলামে মূল বিষয়গুলোয় পাঠ্যতালিকায় বিভিন্ন রোগ ও ভেষজ উদ্ভিদের বর্ণনার সাথে হাজার হাজার ফর্মুলা সম্পর্কে আলোচনা ও হাতে-কলমে শিক্ষা প্রদান করা হয়। তাই আবহমানকাল থেকে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা রোগীদের নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবা দেয়ার লক্ষ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিজেই প্রতিটি উপাদান ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে ওষুধ তৈরি করে দেয়ার নীতি অনুসরণ করে আসছেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ইউনানি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ১৩ (ঞ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে বাংলাদেশ ইউনানি আয়ুর্বেদিক বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারি ও বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি। ইউনানি ফর্মুলারিতে মোট ৬৪৩টি ফর্মুলা ও আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারিতে মোট ৫৮৯টি যৌগিক ওষুধের ফর্মুলা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি লিখতে গিয়ে যেসব প্রামাণ্য গ্রন্থের সাহায্য নেয়া হয়েছে, সেসব গ্রন্থে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের আরো নির্ভরযোগ্য হাজার হাজার ফর্মুলা রয়েছে। এর বেশির ভাগ ফর্মুলাই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ফর্মুলারিতে অনেক জটিল রোগের ফর্মুলা আজো আসেনি। উল্লেখ করা যেতে পারেÑ হৃদশূল (Angina Pectories), মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন (Myocardial Infraction), হার্টব্লক (Heart Block), লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis), আলসারেটিভ কোলাইটিস (Ulcerative Colitis) ুদ্রান্ত্রের টিউমার (Tumours of small Intestine), থ্রম্বোসিস (Thrombosis), মূত্রথলির প্রদাহ (Cystitis of Bladder), মূত্রথলির পক্ষাঘাত (Paralysis of Bladder) প্রভৃতি।
বস্তুত ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিজস্ব দর্শন ও স্বকীয়তা রয়েছে। চিকিৎসক রোগের ইতিহাস, ধরন, অবস্থা, মেজাজ (Temperament) প্রভৃতি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কিংবা প্রয়োজনে আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়পূর্বক ব্যবস্থাপত্র দেন। ব্যবস্থাপত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ওষুধ থাকতে পারে কিংবা নাও থাকতে পারে অথবা চিকিৎসক তাৎক্ষণিক ওষুধ তৈরি করে দিতে পারেন।
বর্তমানে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের দিনেও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ও রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনানি-আয়ুর্বেদিক ওষুধ ব্যবহারের জন্য জোর সুপারিশ করছে। বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে পৃথিবীর জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি, রাষ্ট্রনায়ক ও বিজ্ঞানীরা আজ চিন্তিত। জীবন সাজাতে ও জীবন বাঁচাতে বিশ্বব্যাপী আজ বিজ্ঞানীরা ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে যাচ্ছেন।
মূলত বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারি করা হয়েছে সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সুশৃঙ্খল ওষুধ তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে আনার প্রয়াসে। অথচ সরকারি নীতিনির্ধারকেরা বই দু’টি দিয়ে আবহমানকাল থেকে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা যে নীতি অনুসরণ করে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছেন, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছেন। এটা আসলে মোটেই সুফল বয়ে আনবে না। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কলেজের পাঠ্যতালিকা দেখতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের ওপর ব্যাপক পড়াশোনা থাকতে হবে। চিকিৎসার ধরন ও নিয়মনীতি বুঝতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি-আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারির সামান্য ফর্মুলা নিয়ে যদি আমরা এ চিকিৎসা বিজ্ঞানকে মূল্যায়ন করি এবং এ গ্রন্থদ্বয়কে শেষ গ্রন্থ হিসেবে মনে করি, তাহলে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে। বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের হাজার হাজার নির্ভরযোগ্য ফর্মুলা আমাদের থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাসেবা বাধাগ্রস্ত হবে, প্রকৃত চিকিৎসাসেবা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত হবে এবং সর্বোপরি সারা দেশের ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেসব প্রামাণ্য ফর্মুলার গ্রন্থগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আলোচিত হয়ে আসছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের নাম এখানে তুলে ধরছি যেমনÑ আল কারাবাদিন, কিতাব হাজেক, বয়াজে কবির, মাখজানুল হেকমত, দেহলিকে ছহিহ মুরাক্কাবাত, হামদর্দ ফার্মাকোপিয়া অব ইন্টার্ন মেডিসিন, আয়ুর্বেদ সংগ্রহ, ভাবপ্রকাশ, ভৈষজ্য রতœাবলি, আয়ুর্বেদ শিক্ষা, চিরঞ্জীব বনৌষধি, ভারতীয় বনৌষধি, গ্রিকো আরব কনসেপ্ট কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, কারাবাদিনে হামদর্দ, কারাবাদিনে আজম, কারাবাদিনে কবির, কারাবাদিনে জালালি, কারাবাদিনে সরকারি, কাজকেরায়ে জলিল, কিতাবুল মুরাক্কাবাত, তিব্বে মসিহা, ডিজিজ অব দ্য লিভার গ্রিকো আরব কনসেপ্ট, কিতাবুল নাজমুল গনি, ফিজিকো কেমিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডস অব ইউনানি ফর্মুলেশন প্রভৃতি। এসব গ্রন্থে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের হাজার হাজার নির্ভরযোগ্য ফর্মুলা রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে ইউনানি-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা এসব বইয়ের ফর্মুলা অনুসরণ করে অনেক জটিল রোগের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। এতে দিন দিন ইউনানি-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের কদর বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ইউনানি আয়ুর্বেদিক অভিজ্ঞ রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকদের কাছ থেকে অত্যন্ত আস্থার সাথে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।
বিগত ২০০৪ সালে ভারত সরকার TKDL (Traditional Knowledge Digital Library নামে একটি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। যার প্রধান কাজ হলো ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও যৌগিক ওষুধের (Compound Medicine) কার্যকারিতা-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহপূর্বক লিপিবদ্ধ করা। এ যাবৎ TKDL বিশেষজ্ঞরা ৭৭ হাজার ৬১৬টি ফর্মুলা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব ফর্মুলার কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার জন্য নিয়মিত গবেষণা-কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারত সরকার এসব তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণামূলক কাজ করে ইউনানি-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। অনুরূপ বাংলাদেশে ইউনানি-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে হলে দেশের নীতিনির্ধারকেরা ইউনানি-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের ন্যায্য অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ না করে ভারত, পাকিস্তান কিংবা অন্যান্য দেশের মতো চিন্তাভাবনা করা অতীব প্রয়োজন।
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে