• ...
ঢাকা, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৪৮ মিনিট আগে
ই-পেপার

কেজরি সুনামিতে হাওয়া মোদি ঝড়

আবুল ফারাহ মাসুম
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ৮:৪২
লোকসভায় দিল্লির সব আসনে জয় পাওয়ার মাত্র আট মাসের মাথায় কেজরিওয়াল সুনামিতে হাওয়া হয়ে গেছে নরেন্দ্র মোদি ঝড়। দিল্লির ৭০ আসনের মধ্যে ৬৭টিই আম আদমি পার্টির ঝুলিতে জমা হবে, এমনটি সম্ভবত কেজরিওয়াল নিজেই ভাবেননি নির্বাচনের আগে। আর নরেন্দ্র মোদি-অরুণ জেটলি-অমিত-নাইডুরা দিল্লিতে দলের জন্য খারাপ ফল অপেক্ষা করছে অনুমান করে প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ আড়াল করতে অতীতের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ভারতের প্রথম নারী পুলিশ কর্মকর্তা ও আন্না হাজারের টিম সদস্য কিরন বেদিকে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু বিজেপির হালকা ভাটির টানকে এভাবে তিনি ডুবিয়ে বিপর্যয়কে অনিবার্য করে তুলবেন তা ছিল বিজেপি হাইকমান্ডের হিসাবের বাইরে। ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত এই ষাটোর্ধ্ব রমণী বিজেপির সবচেয়ে নিরাপদ সিট বলে খ্যাত কৃষ্ণনগর থেকে পাঁচ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন আপ প্রার্থীর কাছে। কেজরিওয়ালকে ‘টক্সিড’, ‘বিরক্তিকর’ বলে বক্তৃতা দেয়া বা টিভির আলোচনায় মন্তব্য যে দিল্লিতে ঝাড়–র হাওয়াকে আরো প্রবল করে তুলতে পারে, তা তিনি ভাবেননি।
দিল্লির বিধান সভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির এই মহাবিজয়ের তাৎপর্য রয়েছে অনেক। ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের আভাসও পাওয়া যায় এই ফলাফলে। কেজরিওয়ালের আপ দিল্লির আসনের ৯৬ শতাংশ দখল করেছে ৫৪.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে। অন্য দিকে ৩২.৩ শতাংশের মতো ভোট পেয়ে বিজেপি আসন পেয়েছে ৪ শতাংশ। কংগ্রেস ১০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েও কোনো আসন লাভ করেনি। দিল্লির এ নির্বাচনে বিজেপির বিপর্যয় এতটা প্রবল হতো না যদি কংগ্রেসের ভোট আগের নির্বাচনের চেয়েও ৭ শতাংশ কমে না যেত। এক বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় আম আদমির ভোট যে ২১ শতাংশের মতো বেড়েছে তাতে বড় অংশটিই এসেছে কংগ্রেস ও অ-বিজেপি দল থেকে।
বিজেপির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, লোকসভা নির্বাচনে আগের রাজ্য নির্বাচনের তুলনায় যে ১৩ শতাংশের মতো ভোট বেড়েছিল সে ভোট এবার আর পদ্মফুলের বাক্সে পড়েনি। দোদুল্যমান এ ভোটই ঝাড়–র সাথে তাদের এই বিপুল ব্যবধান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই মেরুকরণ কেন ঘটল সেটি নিয়ে আরো কিছু দিন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলতে থাকবে। তবে আগের নির্বাচনগুলোতে বিজেপি যে কৌশল নিয়েছিল, তা কাজ করেনি দিল্লিতে। বিজেপি চেয়েছিল হিন্দু জাতীয়তার আবহ তোলা সম্ভব হলে দলটির ভোট সংহত হবে। এ কারণে সঙ্ঘ পরিবারের এক কর্তা দিল্লি জামে মসজিদের ইমামসহ সব মুসলিমকে ‘ঘর ওয়াপসি’ হওয়া তথা হিন্দু হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর ইমাম বুখারি মুসলিমদের প্রতি আম আদমিকে ভোট দিতে আহ্বান জানান। এর ঠিক দুই ঘণ্টা পর অরুণ জেটলি সংবাদ সম্মেলন করে ধর্মের ভিত্তিতে সমাজ বিভক্ত করার বিপদ সম্পর্কে যে সতর্কবাণী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা করেছিলেন, সেটি অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।
টিম কেজরিওয়াল এই স্পর্শকাতর প্রচারের রহস্য ধরতে পেরে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে ইমাম বুখারির সমর্থনের প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দেন। যুক্তি দেখান, তিনি জামে মসজিদের এক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছেন। এতে জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের একটি অংশকে আপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা কাজ করেনি। অন্য দিকে মুসলিম ভোটাররা জোর করে হিন্দু বানানোর আরএসএস-বজরং দলের প্রচেষ্টায় সন্ত্রস্ত হয়ে ইমাম বুখারির আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন।
কেজরিওয়ালের একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিলÑ দিল্লিকে ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে বের করে এনে আম আদমির জনপদে পরিণত করা। তার ৭০ জন এমএলএ প্রার্থীর মধ্যে ভিআইপি প্রার্থী ছিলেন মাত্র দু’জন। অন্য দিকে তার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলে এ সংখ্যা ছিল অর্ধেকের মতো। আম আদমির জন্য দিল্লি গড়ার এ স্লোগানে কেজরিওয়াল ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছিলেন। ফলে উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়রা যেমন আপকে ভোট দিয়েছেন, তেমনি তিনি ভোট পেয়েছেন নিজ গোত্র বৈশ্যের। বিজেপি কেজরির গোত্র ‘অরাজকতা’ বলে উল্লেখ করে এই মেরুকরণকে সাহায্য করেছে। এতে কেজরিওয়াল গোত্রের বৈশ্য ব্যবসায়ী সমাজের মর্যাদায় আঘাত লাগে। তারা ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপি থেকে বেশখানিকটা মুখ ফিরিয়ে নেন।
কেজরি জোয়ারের আরেক রহস্য থাকতে পারে দেশ-বিদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রকদের হাতে। তারা বিজেপির জয়ের রথকে দিল্লি দিয়ে বাস্তবতায় নামিয়ে আনতে চেয়ে থাকতে পারেন। বিজেপি সরকারের লাগাম টানার রশি তারা নিজেদের কাছে রাখতে না পারলে অনেক পাওনা আদায় করতে পারবেন না বলে ধারণা করতে পারেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সাথে অনেক ঢাকঢোল পেটানো চুক্তি থেকেও আমেরিকা সর ওঠাতে পারেনি। বিজেপিকে লাগামছাড়া করে এই শক্তিটি পুরনো বঞ্চনা হয়তো আবার ডেকে আনতে চায়নি। তারা তাদের সুপ্ত শক্তি দিয়ে আরেকটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের জন্য বীজ বপন করেছেন দিল্লিতে। আম আদমির বিপুল বিজয় অদূর ভবিষ্যতে বিহার, উত্তর প্রদেশ এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী অ-কংগ্রেসি শক্তিকে একই সমীকরণে দাঁড়িয়ে লড়াই করার জন্য উদ্দীপ্ত করতে পারে। এশিয়ার এই দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির ২০১৯ সালের নির্বাচনে এটিই হতে পারে প্রবল এক রাজনৈতিক বিকল্প ধারা।

পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে