Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /home/dailynayadiganta/public_html/allarchive/archive_hasan/includes/connect.php on line 30
Naya Diganta :: নাইজেরীয় রাজনীতিতে নতুন মোড়
  • ...
ঢাকা, সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | শেষ আপডেট ২৫ মিনিট আগে
ই-পেপার

নাইজেরীয় রাজনীতিতে নতুন মোড়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ৮:৪২
পিছিয়ে গেল নাইজেরিয়ার নির্বাচন। ১৪ ফেব্র“য়ারি হওয়ার কথা ছিল দেশটির প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। দুর্নীতি, অপশাসনের দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তির সন্ধান হয়তো পেতে যাচ্ছিল নাইজেরিয়ার মানুষ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জোনাথন গুডউইলের ইঙ্গিতে নির্বাচন কমিশন একেবারে শেষপর্যায়ে নির্বাচন ছয় সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছে। নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ মার্চ। কমিশনের প থেকে বলা হয়েছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলে কট্টরপন্থী বোকো হারামের তৎপরতার কারণে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। তবে বিশ্লেষকেরা এতে জোনাথন গুডউইলের কারসাজি দেখছেন। তারা মনে করছেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনেই তিনি কলকাঠি নেড়েছেন। নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার সমালোচনা করেছে। বিরোধী দলগুলোও চায়নি নির্বাচন পিছিয়ে যাক।
এবারের নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রার্থী মোহাম্মাদু বুহারির জয় নিশ্চিত ছিল বলেই অনেকের কাছে মনে হয়েছিল। দেশটিতে প্রথমবারের মতো মতাসীন প্রেসিডেন্টের পরাজয় হতে যাচ্ছিল।
এই মোহাম্মদু বুহারি দারুণ চমক এনেছেন নাইজেরিয়ার রাজনীতিতে। অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনকারী এই ব্যক্তিটি সততা আর ঐক্যে বিশ্বাসী। মতাসীন দলের সদস্যরা যেখানে অগণিত গাড়ির জৌলুশের চমকে নির্বাচনে জয়ী হতে চান, সেখানে বুহারি নেমেছেন অত্যন্ত সাধারণভাবে। থাকেনও তিনি একটি ভাড়া করা সাধারণ বাড়িতে। তার যাতায়াতের সময় সরকারি দলের সদস্যদের মতো সাইরেন আর ফাশিং বাতির ঝলকে ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে অন্য গাড়িগুলো সরে যায় না। তবে এটিই তার প্রধান পুঁজি।
৭২ বছর বয়স্ক বুহারি অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে ২০ মাস নাইজেরিয়া শাসন করেছিলেন। তবে এরপর ৪০ মাস তাকে আটক থাকতে হয়েছিল। দেশটির আধুনিক ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে মতা হাতে পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন তিনি। নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং পর্যবেকদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট মনে করছে, তার ও মতাসীন প্রেসিডেন্ট জোনাথন গুডলাকের মধ্যের লড়াইটি হবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, উভয়েই ৪২ শতাংশ করে ভোট পেতে পারেন।
১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনী মতা ছাড়ার পর থেকে নাইজেরিয়া শাসিত হয়ে এসেছে পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) মাধ্যমে। তেল উৎস থেকে পাওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার এই দলটিতে সতেজ রেখেছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে নগদ অর্থের জোগান অনেকটাই কমে গেছে। তেলের দাম কমে যাওয়ার সময়টাতেই নির্বাচন করতে হওয়ায় জোনাথন গুডলাকের জন্য কিছুটা বাড়তি দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনই ঠিকমতো দেয়া যাচ্ছে না, অবকাঠামো প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে গেছে।
তবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার নিজের লোভ। কর্মকর্তারা সরকারি তহবিল তছরুপে কোনো রাখঢাক করেনি, প্রকাশ্যেই চলেছে তাদের পকেট ভারী করার কাজ। গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানান, ২০ বিলিয়ন ডলারের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার সমস্যার জন্য তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার অভিযোগগুলো নিয়ে একটি প্রতিবেদন এখন জোনাথনের টেবিলে রয়েছে। কেবল ব্যাপক চৌর্যবৃত্তি শুধু অর্থনীতিরই বারোটা বাজাচ্ছে না, দারিদ্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি গণনিরাপত্তাহীনতাও সৃষ্টি করছে।
সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে রণাঙ্গনে পাঠানো সৈন্যদের হাতে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও রেশন থাকছে না। মনোবলহীন ও দরকারি অস্ত্রশস্ত্র না থাকায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সশস্ত্র গ্র“পগুলোকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে তারা বিপর্যয়ে পড়ছে। হাজার হাজার লোক নিহত হচ্ছে। এক বছর আগে বোকো হারাম নামে একটি কট্টর ইসলামপন্থী দল দেশটির বিশাল অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চিবক শহর থেকে আড়াই শ’ মেয়ে অপহরণ করার অভিযোগও রয়েছে। সরকার প্রথমে তাতে তেমন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও আন্তর্জাতিক চাপে সক্রিয় হয়েছে।
নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা এখন উত্তপ্ত। প্রায় ১৫ লাখ লোক তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ প্রোপটে অনেক ভোটার বিশ্বাস করেন, ১৯৬০-এর দশকে গৃহযুদ্ধ অবসানের পর থেকে দেশটির অবস্থা যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। দেশটির বেশির ভাগ এলাকা এখনো সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতি বিকশিত হলেও নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই দণি দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে নাইজেরিয়া খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে।
সভা-সমাবেশগুলোতে আগ্রহী লোকজনের সাাৎ পাচ্ছেন না জোনাথন। লোক আনতে হচ্ছে ভাড়া করে। অনেকে প্রায়ই তার বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই চলে যায়। লোকজন যাতে বেশি দেখা যায়, সে জন্য চেয়ারের বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু জানুয়ারির শেষ দিকে একটি জনসভায় ওই চেয়ারই তার দিকে ছুড়ে মারা হয়েছিল। অনেক স্থানে তার বহরে পাথর ছোড়া হয়েছে। তার বিলবোর্ডগুলো রা করতে সেনা নিয়োগ করা হয়েছে। তবে লোকজন সেনাবাহিনীকে এ কাজে ব্যবহার না করে বরং বোকো হারামের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
নির্বাচনে প্রার্থী এবং তাদের দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে সামান্যই। নির্বাচন মূলত সততা ও যোগ্যতাই মূল স্লোগান। সাথে রয়েছে জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচিতি। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নাইজেরিয়ায় বৈচিত্র্যটা একটু বেশিই। প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে ৫০০ ভাষা প্রচলিত। জোনাথন দেিণর খ্রিষ্টান আর বুহারি উত্তরের মুসলমান।
নির্বাচনে কে জয়ী হবেন তা অনেকটাই নির্ভর করছে ভোটাররা ধর্মীয় লাইনে ভোট দেবেন কি না তার ওপর। জিততে হলে বুহারিতে অবশ্যই দেিণর সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান ভোটারদের কাছে টানতে হবে, কারণ উত্তরাংশে মুসলিম আর ইসলাম ধর্ম পুরোপুরি সমার্থক শব্দ নয়। অবশ্য তার পরও উত্তরের প্রধান প্রধান এলাকায় বুহারির সমাবেশে বিপুল উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, তিনিই দেশটাকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন।
তারা এটিও আশা করছে, একসময়ে সেনাবাহিনীতে থাকায় তিনি জানেন কিভাবে সৈন্যদের লড়াইয়ে নিয়োজিত করা যায়, পালানো বন্ধ করা যায়। এ ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতাও আছে। তার কমান্ডেই ১৯৮০-এর দশকে নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী শাদের বিদ্রোহীদের বিতাড়িত করেছিল। এখন ওই এলাকায়ই বোকো হারামের আধিপত্য। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, এখন আবার বোকো হারামকে হারাতে শাদের সৈন্যদের সহায়তা নিচ্ছে নাইজেরিয়া।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার লড়াইও নজরে রাখতে হবে। তিনি যখন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, তখন কোষাগার থেকে তার হাত দু’টি দূরে থাকত, দুর্নীতিবাজ শত শত লোককে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। তিনি ‘বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লড়াই’ শুরু করেছিলেন। লাইনগুলো সোজা রাখার জন্য সৈন্যরা চাবুক হাতে উপস্থিত থাকত, কোনো বেসামরিক কর্মকর্তা দেরিতে অফিসে এলে তাকে ‘ব্যাঙ লম্ফ’ দিতে হতো।
তবে তার সময় হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধী বিনা বিচারে আটক ছিলেন, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল, সংবাদপত্র কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো। শত শত লোককে গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হতো। অনেককে ফাঁসি দেয়া হতো, যদিও তারা যখন অপরাধটি করেছিলেন তখন ওই অপরাধের সাজা ওই দণ্ড ছিল না। তার সেই অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিতে পিডিপি তার সামরিক ইউনিফর্ম পরা ছবি প্রকাশ করেছে এই শিরোনামে : ‘একবার স্বৈরাচার, সব সময় স্বৈরাচার।’
অ্যাক্টভিস্ট ও বিদেশী কূটনীতিকেরা তার অতীত নিয়ে চিন্তিত নন। তার রানিং মেট ইয়েমি ওসিনবায়ো আইনজীবী ও যাজক, মানবাধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সোচ্চার বলে সুনামের অধিকারী। আর বুহারি ইকোনমিস্টকে বলেছেন, ‘দেশের সংবিধানের ব্যাপারে আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে। একবার আমি সামরিক ব্যক্তি ছিলাম। কিন্তু আমি সামরিকীকরণকৃত গণতন্ত্র চাই না।’
তার কোনো ত্র“টি যদি থাকে, তবে তা পিডিপি যেসব অভিযোগ করছে, তার বিপরীতটাই সত্য। তিনি কখনোই শক্তিমানব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তিনি নীতিগত নির্দেশনা দিতেন, কিন্তু বিস্তারিত প্রণয়ন করার কাজটি অন্যদের হাতে ন্যস্ত করতেন। তার দল অল প্রগ্রেসিভ কংগ্রেস (এপিসি) সাম্প্রতিক চারটি বিরোধী দলের একীভূত হওয়ার ফসল। মতাসীন দলের রাঘব-বোয়ালেরা এটিকে মতায় যেতে আগ্রহী ‘প্রার্থীদের দল’ হিসেবে অভিহিত করে নাকচ করে দিয়েছেন। নেতারা ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দিতে না পারায় গত নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী জোটের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। এবার তারা বুহারিকে পছন্দ করার মাধ্যমে সেই কাজটা করতে পেরেছে।
এপিসি এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে, তারা দেশ পরিচালনার যোগ্যতা তাদের আছে। তারা দু’টি সবচেয়ে জনবহুল নগর এলাকা ক্যানো ও লাগোস এবং অর্ধেকের বেশি রাজ্য পরিচালনা করছে। কোনো পরাজয়ের বিরুদ্ধে উভয় দলের সমর্থকেরাই সহিংস প্রতিবাদে নেমে পড়ে। এবারো নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ঘটলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। অনেকে আশঙ্কা করছে, বুহারি জয়ী হলে জোনাথনের নিজ অঞ্চল নাইজার ডেল্টায় সহিংসতা দেখা দিতে পারে। আর জোনাথনের জয় উত্তরাঞ্চলকে আরো উত্তপ্ত করতে পারে। ২০১১ সালের নির্বাচন দেশটির এ যাবৎকালের অন্যতম নিরপে বিবেচিত হলেও তাতে প্রায় এক হাজার লোক নিহত হয়েছে।
এই নির্বাচন নাইজেরিয়ার রাজনীতিতে বিরাজমান একদলীয় শাসনের অবসান ঘটাতে পারে। শক্তিশালী দলটি এত দিন জনগণের সামনে একটি বিশাল মুলা ঝুলিয়ে দিত। এখন তারা দু’টি মুলা ঝোলানো দেখতে পাবে। আর তাতে করে আরো নোংরা রাজনীতি আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে নাইজেরিয়াকে এক রাখা গেলে কিছুটা ভালো সরকারের আশা থেকেই যায়।
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে