Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /home/dailynayadiganta/public_html/allarchive/archive_hasan/includes/connect.php on line 30
Naya Diganta :: ইয়েমেনের সঙ্কট সমাধান কোন পথে?
  • ...
ঢাকা, সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | শেষ আপডেট ২৭ মিনিট আগে
ই-পেপার

ইয়েমেনের সঙ্কট সমাধান কোন পথে?

মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ৮:৪১
ইয়েমেনে গুরুতর রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার দেশটির ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। রাজধানী সানার রিপাবলিকান প্যালেস থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে হুতি নেতারা বলেছেন, তারা পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল’ গঠন করেছেন। পাশাপাশি সংবিধান স্থগিত করে ৫৫১ সদস্যবিশিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় কাউন্সিলের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। হুতি শিয়া বিদ্রোহীদের ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদে রাজধানী সানাসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমে আসে। ইয়েমেনের বিরোধী দলগুলো এ ঘোষণাকে অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এ দিকে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইয়েমেন পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে শিয়া বিদ্রোহীদের অবিলম্বে জাতিসঙ্ঘের নেতৃত্বে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সঙ্কট নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে হাদি সালেহর অধীনে ১৬ বছরেরও বেশি ধরে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ না থাকায় তিনি সহজেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত হন। প্রেসিডেন্ট হয়ে হাদি তার পছন্দের লোকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগের চেষ্টা করলেও তাতে শেষ পর্যন্ত সফল হননি। তিনি ‘সাপের মাথার ওপর নাচার’ নীতি গ্রহণ করে ইয়েমেনের রাজনৈতিক নায়কদের একের বিরুদ্ধে অপরজনকে লাগিয়ে  ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেন। কিন্তু হাদি সালেহর তত ধূর্ত ও রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার অধিকারী না হওয়ায় লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হন।
প্রথমত, হাদি সালেহর ছেলে ও ভাইপোদের সামরিক বাহিনী থেকে অপসারণের পাশাপাশি অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক নেতা জেনারেল আলী মোহসেনকে অপসারণ করে সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া হয় অত্যন্ত বিপর্যয়কর। এতে সামরিক বাহিনী বিভক্ত হয়ে যায় এবং ন্যূনতম পর্যায়ের পেশাদারিত্ব হারিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, হাদি হুতির মতো চরমপন্থী গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর কোনো কৌশল গ্রহণ করেননি। তিনি যখন চরমপন্থী সামরিক নেতৃবৃন্দকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানান তখন সামরিক বাহিনীর সালেহর অনুগতরা হুতিদের সাথে হাত মিলিয়ে রাজধানী সানাসহ কয়েকটি প্রদেশকে তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। হুতি বিদ্রোহীরা সশস্ত্রবাহিনীতে পরিণত হয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। হুতিরা যে রাজধানী সানায় রক্তক্ষয়ী হামলা চালাতে পারে, তা আগে কেউ ভাবেনি। বেশির ভাগ লোক মনে করেছিল হুতিরা দ্রুত রাজধানী ছেড়ে চলে যাবে। গত চার মাসে তারা উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনে তাদের অধিকৃত এলাকার সম্প্রসারণ ঘটায়। এক সময়ে বৈরী সালেহর সহযোগিতায় তারা এটি করতে সক্ষম হয়।
২০১১ সালে সালেহর সরকার থেকে বের হয়ে যাওয়া রক্ষণশীল সুন্নি দলগুলোকে পরাজিত করতে সালেহ হুতিদের সাথে হাত মেলায়। আকস্মিকভাবে হুতি ও সালেহ জোট গঠন করে। অথচ হুতি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হোসাইনের মৃত্যুর জন্য সালেহকেই দায়ী করা হয়ে থাকে। দুই পুরনো শত্রুর মধ্যে গলায় গলায় ভাবের একপর্যায়ে হুতি ও সালেহর গ্রুপ একত্রিত হয়ে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট ভবন ঘেরাও করে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করে। প্রেসিডেন্ট হাদি গৃহবন্দী হওয়ার পরই পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং এর কিছুক্ষণ পরই প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেন। এরপর গোলযোগপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল উত্তরাঞ্চল থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পদত্যাগ করার পর থেকে ইয়েমেনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর আগে বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ ঘেরাও করে প্রেসিডেন্টকে অন্তরীণ করে রাখে।
হুতিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে সঙ্ঘাতে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী দ্রুত পিছু হটে। হুতিরা ইরানের কাছ থেকে সামরিক ও কারিগরি সহায়তা পায় বলে অভিযোগ করা হয়। হুতিরা হাদির বৈধতাকে অবজ্ঞা করে এবং ইসলাহ পার্টির মতো ইয়েমেনের প্রধান ইসলামপন্থী পার্টির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করায় তার ওপর ুব্ধ হয়। হাদি দুঃখজনকভাবে তার নীতি-কৌশলের মাধ্যমে জেপিসিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা কমিটি সালেহ এবং অপর দু’জন হুতি নেতার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও ইয়েমেনের গণতান্ত্রিক উত্তরণে ব্যর্থতার জন্য হাদি সম্পূর্ণভাবে দায়ী নন। অন্য প্রধান রাজনৈতিক অভিনেতাও কৌশলগতভাবে মারাত্মক ভুল করে হুতিদের জন্য সুবিধা করে দিয়েছেন।
ইয়েমেনে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ইসলাহ পার্টি ও সোস্যালিস্ট পার্টি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। দেশের অবনতিশীল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের চেয়ে দল দু’টি বরং প্রাথমিকভাবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও বেসামরিক পদগুলোতে নিজ দলের সদস্যদের রিক্রুট করার কাজে ব্যস্ত ছিল। এতে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক সঙ্কট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তী সরকার অব্যাহত বিদ্যুৎ সমস্যা ও গ্যাসস্বল্পতার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়। মারিব প্রদেশে ছোট ছোট বেআইনি উপজাতীয় গ্রুপগুলো বিদ্যুৎ লাইনে হামলা অব্যাহত রাখে। অধিকন্তু দুর্নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার কারণে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ায় সেখানে রাজনৈতিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
দীর্ঘ দিন ধরে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে থাকা হুতি বিদ্রোহীরা (এখন তাদের নিজেরা আনসারুল্লাহ নাম দিয়েছে) শিয়াদের জাইদি উপগোত্র থেকে এসেছে। ইয়েমেনের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ হচ্ছে তারা। রাজধানী দখল এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করায় হুতি বিদ্রোহীরা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আঞ্চলিক ক্ষমতা কেন্দ্র এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রাখলে তাদের এই বিজয় কি তারা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে? ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াইয়ে হুতিদের আন্দোলন এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত। হিজবুল্লাহর অনুকরণ করে হুতিরা শৃঙ্খলা এবং সামষ্টিক নীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে প্রশংসিত হয়েছে। হুতিরা তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে নির্মমভাবে দমন করেছে। এতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
হাদির অন্তর্বর্তী সরকারের পতনে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় বহুমুখী গৃহযুদ্ধের মোকাবেলা করতে হবে। এখন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কারমান কর্তৃক হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা বিপ্লব হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাওয়াক্কুল কারমান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হাদির সমর্থক। তিনি একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার অভিমত হচ্ছে, হাদি সরকারকেই নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ইয়েমেনের সুন্নিরাও দীর্ঘ দিন সালেহর স্বৈরাচারী শাসনের সুবিধাভোগী ছিল। এখন সুন্নি-প্রধান দক্ষিণাঞ্চল আল হাইরাব আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত। হুতিদের ঐক্যের আহ্বানে তারা সাড়া দেবে বলে মনে হয় না। এ দিকে ইরানের আঞ্চলিক দুঃসাহসিক অভিযান বা কর্মতৎপরতায় সৌদি আরব বেশ ুব্ধ। ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা আইএসের বিরুদ্ধে ইরাকি সৈন্যদের যুদ্ধে সহায়তা দিয়েছে।
সিরিয়ায় হিজবুল্লাহ এখন প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে কাজ করছে। বাহরাইনে সরকার ও আল ওয়াপাক পার্টির মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং সৌদি আরবের নিজ রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে শিয়া আছে। ইরান এখন সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে শিয়াদের নিয়ে নতুন ফ্রন্ট খুলবে কি না সেটা নিয়ে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। যদিও ইরানের হয়তো এত প্রভাব সেখানে এখন নেই। গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইট ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ ড. চার্লস স্কিমিজের সাথে কথা বলেছে। তিনি আনসারুল্লাহ এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি পরিষ্কার নয় বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, তাদের মধ্যে আর্থিক যোগাযোগ থাকতে পারে। কারণ আনসারুল্লাহ মিলিশিয়াদের আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে তারা নিজেরাই স্থানীয়ভাবে কর ও রাজস্ব আদায় করে বলে আনসারুল্লাহ জানিয়েছে। হুতিরাও ইরানের সাথে সম্পর্ক আছে বলে তেমন একটা প্রচার করে না।
প্রেসিডেন্ট ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েমেন নীতির ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন, কিন্তু ওই নীতি কি এখন কার্যকর হবে? পেন্টাগন আরব উপদ্বীপে আলকায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধে হুতিদের সাথে রয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। ড. স্কিমিজ প্রশ্ন করেন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কি হুতিদের ওপর নির্ভর করতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্র আনসারুল্লাহর সাথে একটি রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়তে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, ইয়েমেন শাসন করার জন্য আনসারুল্লাহ কি একটি কার্যকর কোয়ালিশন গঠনের জন্য সমঝোতা করবে? অথবা পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে সেখানে কি শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে? কেউ কেউ আশা করেন আবদুল মালেক আল হুতি হাদিদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যাপারে সমঝোতা করে অচলাবস্থার অবসান ঘটতে পারেন। হুতিদের অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সুর মিলিয়ে সমর্থন নাও দিতে পারে। সব পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতামূলক একটি ঐক্যবদ্ধ সরকারই কেবল ইয়েমেনের বর্তমান সঙ্কটের অবসান ঘটাতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে।
khairulbashar407@gmail.com
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে