• ...
ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৪৭ মিনিট আগে
ই-পেপার

ওবামা-নেতানিয়াহু বিরোধ কেন?

মাসুম বিল্লাহ
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ৮:৪১
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যে যেকোনো দেখাসাক্ষাৎ নেই এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। সেই ২০১১ সালের নভেম্বরে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তির্যক মন্তব্য ছিলÑ ‘আমাকে প্রতিদিনই তো তাকে সামলাতে হবে’। ওবামা প্রশাসনের এ মনোভাব গত অক্টোবরে আরো স্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এ সময় একজন মার্কিন কর্মকর্তা নেতানিয়াহুকে ‘চিকেনশিট’ বা ‘মুরগির বিষ্ঠা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের দেখা যায় পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নের জন্য গলদঘর্ম হয়ে কাজ করতে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ফিলিস্তিনি ভূমিতে বসতি নির্মাণের জন্য ওয়াশিংটনের সমর্থন পেতে তেল আবিব ছিল মরিয়া। তবে এখন ওই ফাটল বুঝিয়ে দেয়ার কাগুজে প্রচেষ্টা কিছুটা শিথিল বলে মনে হচ্ছে। আগামী ৩ মার্চ মার্কিন কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর ভাষণ দেয়ার কথা। সেখানে ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ব্যাপারে ইসরাইলি উদ্বেগ তুলে ধরবেন তিনি।
ওবামা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি নেতানিয়াহুর সাথে দেখা করবেন না। এর পেছনে অজুহাত, তিনি ১৭ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য ইসরাইলের নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চান না।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো জানান, কংগ্রেসের মাধ্যমে রিপাবলিকানরা ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালালে তাতে তিনি ভেটো দেবেন। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা তেহরানের সাথে সমঝোতা প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করবে বলে মনে করেন ওবামা। দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে ব্যাপক আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়া আগামী ২৪ মার্চের মধ্যে ইরানের সাথে একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এরপর ৩০ জুনের মধ্যে পুরোদস্তুর চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
এসব কারণে ওবামা-নেতানিয়াহু সম্পর্কটি কত খারাপ, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে। বিগত অর্ধশতকের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি নেতাদের ব্যক্তিগত রেষারেষি এতটা খারাপ পর্যায়ে কখনো পৌঁছেনি। নেতানিয়াহুর ওপর হোয়াইট হাউজ চরম ক্ষুব্ধ। এই লোকটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ডিঙিয়ে তার পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে এমন একটি ধারণা রয়েছে ওবামা প্রশাসনের মধ্যে। কংগ্রেসের যৌথ সভায় বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানদের বক্তব্য রাখা কোনো বিরল ঘটনা নয়। গত দুই বছরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেট্রো প্রোশেঙ্কো, দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক জিউন হাইকে এই সম্মান দেয়া হয়েছে। কিন্তু এমন কেউই সাধারণত ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেননি।
নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার জন বোহেনার। তিনি একজন রিপাবলিকান। এ আমন্ত্রণের ব্যাপারে তিনি হোয়াইট হাউজ কিংবা কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের অবহিত করেননি। এ ধরনের ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ইসরাইলি দখলদারিত্ব অবসানের পক্ষে প্রচারণা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জোস রুবেনারের মতে, অনেক আগ থেকেই ওবামা-নেতানিয়াহুর সম্পর্ক খারাপ এবং তার উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওবামা-নেতানিয়াহুর সম্পর্ক জোড়া লাগার সম্ভাবনা নেই। তাহলে প্রশ্নটি হচ্ছে, ক্ষমতা থেকে কে আগে বিদায় নিচ্ছেন। ওবামা হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে। নেতানিয়াহুর বিদায় ঘটতে পারে আগামী মাসের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। আর বিজয়ী হলে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসবেন। এখন পর্যন্ত জরিপগুলো বলছে, নেতানিয়াহুর বেলায় যেকোনোটি ঘটতে পারে। তাই সবাই অপেক্ষা করছেন ১৭ মার্চ কী ঘটে দেখার জন্য। এর আগে মার্কিন কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর বক্তৃতা যে ইসরাইলের নির্বাচনকে মাথায় রেখেই দেয়া হবে, এটি ধরে নেয়া যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তার ডানপন্থী মিত্রদের সহায়তা পেতে চান। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেতানিয়াহু রিপাবলিকানদের বেছে নিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদি শয্যাসঙ্গীর মতো। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইল ও রিপাবলিকানদের মধ্যে অতি দহরম-মহরমের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। আমেরিকান রাজনীতিতে ইসরাইল একটি রক্ষণশীল ও ডানপন্থী ইস্যু হয়ে উঠছে।
নেতানিয়াহুর কংগ্রেস ভাষণে কী থাকতে পারে তা নিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্লেষক মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে। নেতানিয়াহুরা মনে করেন পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ইরান হলো ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তারা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানকে ১৯৩৮ সালের যুদ্ধংদেহী নাৎসি জার্মানির সাথে তুলনা করে। নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য রাষ্ট্রশক্তিগুলোর প্রতি আহ্বান জানাবেন যেন ইরানের সাথে এমন কোনো পারমাণবিক চুক্তি না করে, যা ইসরাইলকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
নেতানিয়াহুর মনোভাব নিয়ে বিশ্লেষকরদের মধ্যে দুই মত। একপক্ষ মনে করে, নেতানিয়াহু ভাবছেন যে, ওবামা ইসরাইলকে বেচে দিচ্ছেন। তাই তিনি ইরানের সাথে আলোচনা বানচালের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। অন্য পক্ষের অভিমত, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইরানের ব্যাপারে কট্টর নীতি অব্যাহত রাখতে হোয়াইট হাউজকে চাপ দিতে চান। এতে ইরানের সাথে কোনো পারমাণবিক চুক্তি হলেও তা হবে অনেক কঠোর। কিছু বিশ্লেষকের মতে, ডেটলাইনের আগেই ইরানের ওপর যেন আরো কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, সে জন্য রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করে আলোচনা বানচাল করতে চান নেতানিয়াহু। অন্যদের মতে, নেতানিয়াহু আসলে চান আলোচনা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে ওবামা প্রশাসন যেন কঠোর নীতি অবলম্বন এবং বাড়তি নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেয়।
কংগ্রেসে ভাষণ দেয়ার খবরে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলপন্থী ডেমোক্র্যাট এবং স্বদেশে বিরোধী রাজনীতিকদের কাছ থেকে নেতানিয়াহু যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন, তাতে তিনি অবাক হতে পারেন বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। তাদের মতে, নেতানিয়াহু তার ডেমোক্র্যাট বন্ধুদেরকে তাকে সমর্থন দেয়া এবং ওবামাকে অপদস্থ করাÑ এ দুয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলে গুরুতর ভুল করে ফেলেছেন। পররাষ্ট্রনীতি একটি দলীয় বিষয় হতে পারে কিন্তু একজন বিদেশী নেতা যত ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হন না কেন তিনি যদি এটি ঠিক করে দিতে যান তাহলে তার জন্য এটি অনেক বেশি চাওয়া হয়ে গেল।
ইরানের সাথে ছয় বিশ্বশক্তির আলোচনার মেয়াদ বারবার বাড়ছে এর ধীর অগ্রগতির কারণে। গত মাসে জেনেভায় যে বৈঠক হয় তার অগ্রগতিও খুব কম। কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে যতই দেরি হবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থীরা ততই খুশি হবেন। ওবামার মতে, কংগ্রেসে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তা হবে ইরানকে আলোচনা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করার শামিল। এতে যুদ্ধের আশঙ্কা আরো বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। তাই ওবামা ইরান ইস্যুতে নীতিগত পরিবর্তন আনার পক্ষে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসলে দেশটিকে নিয়ে নয়, দেশটির সাথে আরেকটি সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা সেখানে বোমা হামলা চালানো এর দু’টিই এড়িয়ে যেতে চাইলে সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন। এখানে কূটনীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। যে বিষয়টি আসলেই ওবামার জন্য মনোপীড়ার কারণ তাহলো তিনি সত্যিকারভাবেই বিশ্বাস করেন যে, কূটনৈতিক কৌশল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে পারবে। কংগ্রেস ও ইসরাইল মিলে যদি এই প্রচেষ্টা বানচাল করে দেয় তাহলে শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের নিরাপত্তাই অধিক হুমকির মুখে পড়বে বলে ওবামা মনে করেন।
মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতি ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলবে কি না এটাও এখন একটি বড় প্রশ্ন। গত বছর এই শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙে যায়। এর মধ্যস্থতা করছিল ওয়াশিংটন। শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎও এ মুহূর্তে অন্ধকার। ফিলিস্তিনিরা তাদের রাষ্ট্রের দাবি জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে বিশ্লেষকদের অভিমত হলো ওবামা-নেতানিয়াহুর সম্পর্কে টানাপড়েন ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনের নীতিকে লাইনচ্যুত করবে না। জাতিসঙ্ঘ ও আইসিসিতে ফিলিস্তিনি উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা এর সাক্ষ্য দেয়। এত কিছুর মধ্যেও ইসরাইলকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন এযাবতকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। হ
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে