• ...
ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৫৫ মিনিট আগে
ই-পেপার

সদ্ব্যবহার সৌভাগ্যের উৎস

মাওলানা জাফর আহমাদ
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার, ৮:৪০
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। নবী সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের পার্থিব কষ্টগুলোর মধ্য থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি বড় কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর অভাবের কষ্ট লাঘব করে দেয়, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার অভাবের কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। বান্দা যতণ তার অপর মুসলমান ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকে, আল্লাহও ততণ তার সাহায্য-সহায়তা করতে থাকেন’ (মুসলিম শরিফ : ২৪৫ সংপ্তি)।
মুসলিম শরিফের উল্লিখিত হাদিসটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের এমন কতগুলো কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা জীবন চলার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি এখানে মাত্র চারটি কাজ উল্লেখ করলামÑ ১. কষ্ট দূর করে দেয়া, ২.অভাব লাঘব করা, ৩. দোষ গোপন করা ও ৪.সাহায্য করা। 
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ মানুষ এককভাবে বেঁচে থাকা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। তাই সমাজের প্রত্যেক সদস্যই পরনির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার গুরুত্বকে বিবেচনায় এনে রাসূল সা: একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে উল্লিখিত বিষয়গুলো আলোকপাত করেছেন। আপনি গভীরভাবে চিন্তা করুন, হাদিসে উল্লিখিত চারটি মৌলিক বিষয় যদি কোনো সমাজের সদস্যরা দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করত, তাহলে সেখানকার সামাজিক পরিবেশ কী হতো? এ হাদিসটির ওপর আমল করা হলে আমাদের সমাজের যত হানাহানি, মারামারি, অভাব-অনটন ও সামাজিক অস্থিরতা আছে তা বহুলাংশে কমে যেত। শান্তি-সুখের সমাজ গড়ে উঠত। সমাজটি হয়ে উঠত ফুলে-ফলে সুশোভিত। 
হজরত আবু মাসউদ রা: বলেন, আমি একজন ভৃত্যকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিলাম। এ সময় আমার পশ্চাতে একটা শব্দ শুনলাম : ‘জেনে রেখো, হে আবু মাসউদ! আল্লাহ তায়ালাই তোমাকে এ ভৃত্যের ওপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন।’ আমি বললাম : ইয়া রাসূলুল্লাহ সা:! আমি আর কখনো দাস-দাসী ও চাকর চাকরানীকে প্রহার করব না। আমি ওকে স্বাধীন করে দিলাম। রাসূলে করিম সা: বললেন, ‘এ কাজটি না করলে আগুন তোমাকে কিয়ামতের দিন ভস্মীভূত করে দিত’(সহিহ মুসলিম)।
মানুষের তি করা, মানুষকে কষ্ট দেয়া খুবই সহজ কাজ। তাই বলে মানুষের একটি কষ্ট দূর করা বা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যে খুবই কঠিন তা কিন্তু নয়। প্রয়োজন শুধু একটু সদিচ্ছা আর আল্লাহকে ভয় করা ও রাসূল সা:-এর প্রতি ভালোবাসা। মানুষের একটি কষ্ট দূর করা আপনার জন্য পানি-ভাতের মতোই মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এখানে কঠিন বলতেও কিছু বিষয় আছে। তা হলো, আপনার বদঅভ্যাস বা বদমানসিকতা। যা দীর্ঘ দিন ধরে আপনার ভেতর বাসা বেঁধে আছে এবং ইতোমধ্যে যা আপনার চরিত্র, আপনার আচার-আচরণ, আপনার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনের বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে। আর সেই বদঅভ্যাস বা বদমানসিকতা হলো, আপনি পরশ্রীকাতরতার মারাত্মক রোগে আক্রান্ত, অন্যের কষ্টে আপনার ভেতরটা সব সময় পুলকিত হয়, অন্যের বিপদে মনে আনন্দ অনুভূতির সৃষ্টি হয়, অন্যের উন্নতি আপনার মনোকষ্টের কারণ হয়। আর্তমানবতার ব্যাপারে আপনি এতই উদাসীন যে, আপনি তাদের জন্য কোনো কিছু করতে না পারলেও, আপনার মনটা তাদের দুর্দশা দেখে কেঁদে ওঠা উচিত ছিল, কিন্তু সেখানেও আপনার মনমানসিকতা এতই রোগাগ্রস্ত যে, আপনার কোনো ভাবাবেগ ও অনুভূতিও সৃষ্টি হয় না। এগুলো সারানো আপতত আপনার জন্য একটু কঠিনই হবে। তবে আগেই বলা হয়েছে, ঈমানদাররা একটু চেষ্টা করলে খুব একটা কঠিন হবে না। 
যারা জেনে বুঝে মানুষকে কষ্ট দেয়, তাদের ঈমান নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ ধরনের চরিত্র ও ঈমান পাশাপাশি একসাথে চলতে পারে না। মানুষের তি করা বা তাদেরকে কষ্ট দেয়া কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি আল্লাহর রাসূল সা: এ ধরনের লোককে মুসলিম বলতেও নারাজ। তিনি বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি মুসলিম যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ সুতরাং কোনো মুসলিম অন্য কোনো মুসলিমকে কষ্ট দিতে পারে না। যদি কষ্ট দেন তবে তিনি অমুসলিম হিসেবে চিহ্নিত হবেন। আর এটি জুলুমও বটে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: জুলুম সম্পর্কে কঠিন কঠিন বাক্য প্রয়োগ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জুলুমবাজরা তাদের অত্যাচারের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে’ (সূরা শুরা : ২২৭)।
কথিত আছে, মতা হারানোর পর রাজা খালেদ বিন বারমাক ও তার ছেলে কারাবন্দী হলে তার ছেলে বলল, ‘আব্বা, এত সম্মান ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকার পর এখন আমরা কারাগারে?’ খালেদ বললেন : ‘হ্যাঁ, বাবা! প্রজাদের ওপর জুলুম চালিয়ে আমরা যে রজনীতে তৃপ্তির সাথে নিদ্রা গিয়েছিলাম, আল্লাহ তখন জাগ্রত ছিলেন এবং মজলুমদের দোয়া কবুল করেছিলেন।’ জনৈক আরব কবি বলেছেন, ‘মতা থাকলেই জুলুম করো না, জুলুমের পরিণাম অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। জুলুম করার পর তুমি তো সুখে নিদ্রা যাও, কিন্তু মজলুমের চোখে ঘুম আসে না। সে সারা রাত তোমার জন্য বদ দোয়া করে এবং আল্লাহ তা শোনেন। কেননা তিনিও ঘুমান না।’ রাসূল সা: বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন : তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদসমূহকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য’ (বুখারি, মুসলিম ও তিরমিজি)। 
লেখক : ব্যাংকার
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে