• ...
ঢাকা, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৪৬ মিনিট আগে
ই-পেপার

পারস্পরিক মমত্ববোধ কেমন হওয়া উচিত

তৌহিদুল ইসলাম
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার, ৮:৪১
ভালোবাসা এমনই। কেউ কেউ এক চিলতে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাদের গোটা জীবনই অপোর প্রহরে কাটিয়ে দেয়। আশায় বুক বাঁধে। কেউ পায়, কেউ পায় না। কেউ শুধুই দিয়ে যায়, আবার কেউ শুধুই পেতে চায়। তারা মনে করে, ভালোবাসা এমন একটি স্থান যেখানে পৌঁছতে পারাই জীবনের একমাত্র সফলতা। তাদের চিন্তা, মেধা, মনন, অর্থÑ সবই খরচ করে একটি সুন্দর ভালোবাসার গল্প তৈরির উদ্দেশ্যে। 
বিয়ের আগে এই মরীচিকা এতই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যে, তারা মনে করে, বিয়ের রঙিন জীবনে কাক্সিত ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হলেই সে বুঝি সেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারবে; অথচ বিয়ের পরে মানুষ ইঞ্জিনের মতো শুধুই চলতে থাকে। এই চলার পথে সে নিজের ঘুম, আরাম-আয়েশ, আবেগ সব কিছুকেই বিসর্জন দিতে পারে। ভালোবাসাকে খোঁজার সময় তখন তার আর থাকে না। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এলে সে বুঝতে পারে, ভালোবাসা তাকে পূর্ণতা দেয়নি। আরো বুঝতে পারে, জীবনের ল্েয পৌঁছতে ভালোবাসা কেবল একটি মাধ্যম হতে পারে; কিন্তু এই মাধ্যমের জন্য ল্যকে উৎসর্গ করা জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন সে ভাবে তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন, নাটক, গান বাজনা কোনো কিছুই মানুষকে পূর্ণতা ও তৃপ্তি দেয় না। দেয় না বলেই কোনো কোনো মানুষ সুখের আশায় ভালোবাসাকেই ডিভোর্স দিতে কার্পণ্য করে না। 
আবার দুনিয়ার ভালোবাসাকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় জর্জরিত হয় হতাশা আর বেদনায়। যারা এই বেদনাকে বিদীর্ণ করতে ব্যর্থ হয়, বারবার যারা হতাশাকে স্মরণ করে নিজেদের কষ্ট দেয়, তারা সেই হতাশার বিষাক্ত ও দূষিত পানি পান করতেই থাকে। এভাবে সে নিজের মধ্যে বারবার মরে, হাজারবার মরে। এ যেন কুকুরের মতো নিজ লেজে চুমু খাবার ব্যর্থ চেষ্টা। কুকুরটি মনে করে, লেজে চুমু খেলেই চূড়ান্ত সুখ। সে লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে; কিন্তু মুখ যে লেজ ছুঁতে পারে না। একসময় সে ধপাস করে পড়ে যায়। সম্বিৎ ফিরে পেলে সে বুঝতে পারে, তার চুল সাদা হয়ে গেছে অজান্তে। তার জীবনের আর সময় বাকি নেই। এই তো জীবন। আল্লাহ বলেন, ’দুনিয়ার জীবন বাহ্যিক চাকচিক্য, পারস্পরিক অহমিকা, সন্তানসন্ততি আর ধন সম্পত্তিতে পরস্পর এগিয়ে যাওয়া মাত্র। এ যেন এক পশলা বৃষ্টি, যার ফসলের সমাহার কৃষকের মন ভরিয়ে দেয়। অতঃপর তা শুকিয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করে, এরপর তা খড়কুটায় পরিণত হয়। এর বিপরীতে রয়েছে আল্লাহর মা ও সন্তুষ্টি। ‘দুনিয়ার জীবন ধোঁকাবাজি আর প্রতারণার সামগ্রী বৈ কিছুই নয়’ (সূরা আল হাদিদ : ২০)।
যে ভালোবাসার গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মানুষ ভালোবাসার গল্প তৈরি করতে চায়, সেই ভালোবাসা তাকে তৃপ্ত করে না। কারণ এই ভালোবাসাকে তিল তিল করে গড়ে ভালোবাসার মানুষটিই একসময় দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়। আবার কখনো কখনো সে নিজেই চলে যায় আগে। পান্তরে মৃত্যুর পরের অনন্ত জীবনের ল্েয যারা ভালোবাসাকে পেতে চায় তারা ভালোবাসাকে ভালোবাসে না, বরং ভালোবাসে ভালোবাসার সৃষ্টিকর্তাকে। সে ভালোবাসার গল্প কখনো শেষ হয় না; বরং জীবন শেষ হওয়ার সাথেই সেই ভালোবাসার শুরু। সেই ভালোবাসার আকাক্সায় নিজের চরিত্র, ব্যবহার, আচার, কর্ম, জ্ঞান, শ্রদ্ধা, বিনয়, মহব্বত, হৃদ্যতা গঠনই ভালোবাসার শিা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ভালোবাসো তোমাদের পিতা, তোমাদের স্ত্রী, পরিবার, ধনসম্পদ, ব্যবসাবাণিজ্য আর ঘরবাড়ি। আর এগুলোকে যদি আল্লাহ আর আল্লাহর রাসূলের চেয়েও বেশি ভালোবাসো তাহলে অপো করো আল্লাহর ঘোষণা আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ কোনো ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না’ (সূরা তওবা : ২৪)। মানুষ তার হৃদয়নিংড়ানো ভালোবাসা যখন এসব জিনিসের জন্য রাখে, তখন হৃদয় তা ধারণ করতে পারে না। কারণ হৃদয়ের যে স্থান রাখা হয়েছে ভালোবাসার জন্য সেই হৃদয় তৈরিই করা হয়েছে, ভালোবাসার সৃষ্টিকর্তার জন্য।
মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই অন্য মানুষের রূপ-গুণকে ভালোবাসে এ জন্য যে, আল্লাহ তার অপার সৌন্দর্যের কিছু প্রতিচ্ছবি ওই সব মানুষের মধ্যে দিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত রূপ-গুণের জন্য যদি মানুষ মানুষকে এত ভালোবাসে তাহলে সেই ভালোবাসার সৃষ্টিকর্তা কত সুন্দর!! মানুষের সব চিন্তা-চেতনা, মনন, জ্ঞানার্জন, চেষ্টা, সাধনা যখন আল্লাহর জন্যই হয়ে যায় তখন জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়, ভালোবাসাময়। সে জীবনে হতাশা, গ্লানি, ছলনা নেই। সেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নয় (বরং) দেয়ার জন্য। সেই ভালোবাসা স্বার্থহীন, চিরস্থায়ী। সেই ভালোবাসা ব্যক্তির চরিত্রকে করে সুন্দর, চিত্তকে করে প্রসিদ্ধ, চিন্তাকে করে পরিশুদ্ধ, কর্মকে করে পরিশীলিত, সমাজকে করে আলোকিত ও শান্তিময়। 
জীবনযাত্রায় মানুষ তাকেই ভালোবাসে যে তাকে কিছু দেয়। এই দেয়া-নেয়া ণস্থায়ী ও পরিবর্তনশীল হওয়ায় ভালোবাসা হয়ে যায় শর্তযুক্ত। পান্তরে সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসলে তা শর্তহীন ও অপরিবর্তনীয়। সেটি নিশ্চিত। এই ধরনের ভালোবাসা বিরল। ভালোবাসার সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসলে হারানোর কিছুই নেই। মানুষ তাই ভালোবাসে যা আল্লাহ ভালোবাসেন, তাই করেন যা আল্লাহ পছন্দ করেন, তাই বলেন যা আল্লাহ বলতে বলেছেন, তাই বর্জন করেন যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তার মেধা, মনন, পছন্দ, অপছন্দ, কামনা, বাসনা, জ্ঞানার্জন, পথচলা, ভালোবাসা সবই হয়ে যায় আল্লাহর জন্য, আল্লাহর কারণে এবং কেবলই আল্লাহর উদ্দেশ্যে। কারণ ‘যে আল্লাহর দিকে হেঁটে যায়, আল্লাহ্ তার দিকে দৌড়ে যান’ (আল হাদিস)। ‘যিনি আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট’ (আল কুরআন)। ‘হে নবী, আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমার কথা মেনে চলো, আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন’ (সূরা আল ইমরান : ৩১)। অর্থাৎ আল্লাহকে ভালোবাসার অর্থ হলো তার হুকুম মেনে চলা। দুনিয়ায় মানুষের জীবন সংপ্তি হলেও সেই জীবনের ল্য ও মূল্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ এবং ব্যাপক। তাই হতাশা ও কষ্ট নিয়ে পড়ে থাকার সময় তার নেই। তার কাছে ভালোবাসার অর্থ সঙ্কীর্ণ নয়; বরং অনেক বড়। তার ভালোবাসার জন্য বিশেষ দিবসের প্রয়োজন নেই। 
প্রতি বছর ভালোবাসা দিবসের ভালোবাসায় মাতোয়ারা থাকে রেস্তোরাঁ, পার্ক, শপিংমল, স্কুল, কলেজ, হাটবাজার, এমনকি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া। ভার্সিটিতে বের হয় ভালোবাসা র‌্যালি। পার্ক, উদ্যান, লেকপাড় পরিণত হয় তরুণ-তরুণীর প্রেমকুঞ্জে। অনেকে অবচেতনভাবেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে; অথচ তারা জানেও না তারা কত বড় অপরাধ করে ফেলছে। কিন্তু এ দিনটি উদযাপন করা কোনো স্বভাবসিদ্ধ ও স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। বরং একজন ছেলেকে একজন মেয়ের সাথে সম্পর্ক জুড়ে দেয়ার পাশ্চাত্য কালচার আমদানি। ফলাফল : সমাজে চারিত্রিক পদস্খলন। বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে স্যাটেলাইটের কল্যাণে মুসলিম সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুসরণ করছে। নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে তারা আজ প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে তাদের কর্মকাণ্ডে মুসলিম জাতির শির অবনমিত হচ্ছে। মুসলিম সমাজে একসময় নীতি-নৈতিকতার মূল্য ছিল সীমাহীন। লজ্জাশীলতা ও শুদ্ধতা ছিল সেই সমাজের অলঙ্কার। সেই অবস্থা থেকে আজ আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? আমাদের দেশের ভ্যালেন্টাইনরা যাদের অনুকরণে এ দিবস পালন করে তাদের অনেকেরই ভালোবাসা জীবনজ্বালা আর জীবন জটিলতার নাম, নৈতিকতার বন্ধনমুক্ত হওয়ার নাম। বিলাতের ভ্যালেন্টাইন ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে মুসলিমরাও যদি একইভাবে এ দিবসটি পালন করে তাহলে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য থাকে কোথায়? মন থেকে কাউকে ভালোবাসার মধ্যে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে বৈধ পন্থায়, সঠিক প্রক্রিয়ায়। 
লেখক : ব্যাংকার
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে