• ...
ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৫৫ মিনিট আগে
ই-পেপার

ভালোবাসা : ইসলাম কী বলে

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার, ৮:৪১
ছোঁয়াছে রোগের মতো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নামে একটি দিবস এখন অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের যুবসমাজও অবলীলায় ও মহাসমারোহে পালন করছে। এটি বিজাতীয়, নির্লজ্জ ও নগ্ন সংস্কৃতি। মুসলিম যুবসমাজকে ধ্বংস করার অতীত ষড়যন্ত্রেরই বর্তমান রূপ হচ্ছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আজ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি, সভ্যতার নামে অসভ্যতা, বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনা দ্বারা পুরো মুসলিম যুবসমাজকে বিপথগামী ও চরিত্রহীন করার জন্য মরণপণ চেষ্টা চলছে। কালের বিবর্তনে আজ আমাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। মুসলমানেরা আজ আপন সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে অন্যদের সংস্কৃতি গ্রহণ করছে। 
বর্তমানে ভালোবাসা মানেই যুবক-যুবতীর অবৈধ মেলামেশা, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা, যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক বালেগ নারী-পুরুষের ওপর পর্দার বিধান রক্ষা করা ফরজ। ইসলাম বিয়েপূর্ব নারী-পুরুষের কোনো সম্পর্ককেই বৈধতা প্রদান করে না। চাই তা যেভাবেই হোক না কেন। দেখা-সাক্ষাৎ, চিঠিপত্র আদান-প্রদান, পারস্পরিক কথাবার্তাÑ এই সবই নাজায়েজ ও মারাত্মক গুনাহ। এ বিষয়ে অসংখ্য কুরআনের আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। 
ভালোবাসা একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটি মূলত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার ফল। মানুষ ভালোবাসার ক্ষেত্রে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। বিষয়টির ওপর মানুষের হাত না থাকায় রাসূল সা:ও আপন স্ত্রীদের পালা বণ্টন করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার যতটুকু সাধ্য ছিল আমি ইনসাফ করার চেষ্টা করেছি, আর যে বিষয়টি আমার সাধ্যে নেই (অর্থাৎ কোনো স্ত্রীর প্রতি বেশি ভালোবাসা), সে বিষয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করবেন না।’ [সুনানে তিরমিজি : ৩/১৮৫, হাদিস নং ১১৪০, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৪/৪১৪] তবে ভালোবাসা মানেই অবৈধ নয়। কিছু কিছু ভালোবাসা শরিয়তে কাম্য। সেটার প্রতি শরিয়ত উৎসাহ প্রদান করেছে। 
ভালোবাসার প্রকারভেদ : ১. বৈধ ভালোবাসা : বৈধ ভালোবাসা হলো স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা। স্বামী-স্ত্রীর মাঝের ভালোবাসা হচ্ছে পবিত্র ও কাক্সিত। ইসলাম এই ভালোবাসার প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূল সা: তাঁর স্ত্রীদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতেন। তাদের মন জয় করার চেষ্টা করতেন। তাদের নিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করতেন। হাদিস শরিফে আছে, ‘রাসূল সা: হজরত আয়েশা রা:-এর সাথে দৌঁড় প্রতিযোগিতা করেছেন।’ আয়েশাকে নিয়ে মসজিদে তিনি আবিসিনীয়দের খেলা দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন, যার চরিত্র সুন্দর, তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ [রিয়াদুস সালিহিন, ১/১৯৭]
বিয়ের আসল উদ্দেশ্য হলো, শান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। হাদিসে আছে, রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘যদি কোনো স্বামী স্ত্রীর দিকে দয়া ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায় তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার দিকে দয়া ও রহমতের দৃষ্টি নিয়ে তাকান।’ এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, তাদের প্রতি রহম করা ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামীর কাছে ভালোবাসা চায়। স্বামীদের উচিত, স্ত্রীদের ভালোবাসা ও তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা।
বিয়ের দ্বারা অনেক জৈবিক চাহিদা পূরণ হয়। তবে তা শুধু বৈষয়িক ব্যাপারের মধ্যে সীমিত নয়। বরং বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসাপূর্ণ ও আবেগময় পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।  
২. অবৈধ ভালোবাসা আজ আমাদের সমাজে যুবক-যুবতীদের মাঝে বিবাহপূর্ব যে অনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভালোবাসা সৃষ্টি হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ হারাম। ইসলাম কখনো এ ধরনের ভালোবাসা সমর্থন করে না। এটি মূলত যৌন তাড়নাপ্রসূত একটি বিষয়। যুবক-যুবতীরা পাশবিকতা চরিতার্থ করার জন্য ভালোবাসায় আবদ্ধ হন। যখন যৌন তাড়না নিঃশেষ হয়ে যায় তখন ভালোবাসায় ভাটা পড়ে। তবে একে-অপরের ভালোবাসা যদি শুধু তাদের মনে লুকায়িত থাকে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে শরিয়ত লঙ্ঘন না করে, তাহলে সে ভালোবাসায় কোনো ক্ষতি নেই। হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসে, তা লুকিয়ে রাখে, নিজেকে পবিত্র রাখে এবং এই অবস্থায় মারা যায় সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে।’ [কানজুল উম্মাল : ৩০/৭৪] সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য তিনি তো আল্লাহর কাছে অবশ্যই বিনিময় পাবেন। তবে ভালোবাসার কারণে যদি অবৈধ কাজে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে তা অবশ্যই হারাম। এটি একটি মানসিক রোগ। যার আশু চিকিৎসা প্রয়োজন। 
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ছেলেমেয়ের মাঝে যদি ভালোবাসা থাকে এবং তারা বিয়ের প্রতীক্ষায় থাকেন সে ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত ছেলেমেয়ের সেই সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়া। ছোটখাটো বিষয় বিবেচনায় না এনে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়াই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘ভালোবাসায় আবদ্ধ দুইজন পুরুষ-মহিলার মাঝে বিয়ের চেয়ে উত্তম কোনো ব্যাপার নেই।’ এই হাদিসটির প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমাদের কাছে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। এক ব্যক্তি রাসূল সা:-এর নিকট এসে বলল, আমার যতেœ একটি ইয়াতিম বালিকা আছে। দুইজন ব্যক্তি তাকে বিয়ে করতে চায়। একজন দরিদ্র, অন্যজন ধনী। কিন্তু ইয়াতিম বালিকাটি দরিদ্র লোকটিকে ভালোবাসে এবং তাকেই বিয়ে করতে চায়। তার কথা শুনে রাসূল সা: বলেন, ‘ভালোবাসা আবদ্ধ দুইজনের মাঝে বিয়ের চেয়ে আর কী উত্তম হতে পারে?’
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম একটি প্রায়োগিক ধর্ম। কারো সাথে ভালোবাসা হয়ে যাওয়াটা একটি স্বভাবগত বিষয়। ইসলাম এই স্বভাবগত বিষয়টিকে শরিয়তসম্মত রূপদানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। যাতে ছেলেমেয়ে অবৈধ কোনো কর্মে লিপ্ত না হতে পারে। বেশির ভাগ বাবা-মা সামান্য কারণ দেখিয়ে, বা নিজেদের বংশমর্যাদা রক্ষার অজুহাতে ভালোবাসায় আবদ্ধ দুইজন ব্যক্তির মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। ফলে তারা নিজেরাও বিপদে পড়েন, সন্তানদেরও বিপদে ফেলেন। অনেক সন্তান জেদি হয়ে থাকে। তারা বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে অন্য জীবন বেছে নেয়। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তা ছাড়া বাবা-মা যখন জোর করে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তকে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন, তখন সন্তান পরিবারে নিজেকে নিঃস্ব ও অসহায় ভাবে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই পরে সে তালাক-ডিভোর্সের মতো জঘন্য কোনো অপরাধ করে। মোদ্দাকথা পরিবারের কোনো সন্তানের প্রতি যখন জোর করে কোনো বিষয় চাপিয়ে দেয়া হয় অথবা তাদের সিদ্ধান্ত ও আবেগকে পূর্ণরূপে অবজ্ঞা করা হয়, তখন তাদের মাঝে জেদ, হিংসা-বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতার মতো ভয়ঙ্কর অমানবিক দোষগুলো তাদের অবচেতন মনেই আয়ত্ত হয়ে যায়। আর এগুলো নিজের বাবা-মা, ভাইবোন এমনকি নিজের জীবনের প্রতি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করে না। পরিবারে যদি ভালোবাসা ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে তাহলে সেই পরিবারের সন্তানেরা মানবীয় জঘন্য প্রবৃত্তিগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিকতা চর্চা করতে পারে। তখন পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হয়। অনেকে প্রিয় মানুষকে না পেয়ে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে মাদকাসক্ত হয়ে যায়। সেই সাথে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকাসক্তদের অনেকেই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অথবা পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে না হওয়ার কারণে প্রাথমিক অবস্থায় মাদক গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে তা নেশায় পরিণত হয়। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ ছিনতাই, চাঁদাবাজির মতো ঘটনাও ঘটায়। এ জন্য উচিত বংশমর্যাদা বা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতাকে মূল মানদণ্ড না বানিয়ে বরং দ্বীনদারিকে মানদণ্ড বানানো। উভয়ের মাঝে চরিত্রগত দ্বীনদারির দিক থেকে বড় ধরনের পার্থক্য না থাকলে সেই সম্পর্ককে প্রত্যাখ্যান না করে বিয়ের ব্যবস্থা করাই শ্রেয়। রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের কাছে এমন প্রস্তাব আসবে যাদের দ্বীনদারির ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট ও নিশ্চিত, তাহলে তোমরা তাদের বিয়ের জন্য নির্ধারিত করে নাও। যদি এমন না করো তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা, ফাসাদ ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে।’
লেখক : সম্পাদক, মাসিক আরবি ম্যাগাজিন, ‘আলহেরা’
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে