• ...
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৫৩ মিনিট আগে
ই-পেপার

মনিরউদ্দীন ইউসুফ

আসাদ চৌধুরী
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার, ৮:৪২
অনেক মুকুল ঝরেছে য়ূসুফ
জানি
শেষ ক’টি কথা ফুল হয়ে ফুটে
থাক।
[গজল : ১৩]
 
বাংলা একাডেমিতে, সহকর্মী এবং কবিবন্ধু মুহম্মদ নুরুল হুদার কক্ষেই তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। তখন তার শাহনামা ছাপার কাজ চলছিল। আমি সে সময় মোটেও পড়তে উৎসাহী হইনি। তবে সুদর্শন, সুবেশী শরীফ মানুষটি তীব্রভাবে আমাকে আকর্ষণ করেছিলেন।
টের পেলাম শুধু ফারসি বা উর্দু সাহিত্যেই যে তার অবাধ বিচরণ তা নয়, ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগ সম্পর্কে তার অধিকার এবং প্রীতি যথেষ্ট। বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিক গতিধারা সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহী, তবে নিজস্ব কাব্যভাষাকে এগিয়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে তার যথেষ্ট কুণ্ঠা রয়েছে।
তাসাউফ-তত্ত্ব, রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্যÑ সব বিষয়ে তার সাথে অসঙ্কোচে মতামত-বিনিময় সম্ভব ছিল, কেননা তিনি সহিষ্ণু এবং ধৈর্যশীল এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। নিজের মত কোমলভাবে, মৃদু কণ্ঠে উচ্চারণ করেন; কিন্তু সেখান থেকে তাকে টলানো অসম্ভব। তার দৃঢ়তা প্রদর্শনের নিজস্ব একটা ভঙ্গি ছিল, আমি তাতেই বেশি করে আকৃষ্ট হতাম। বয়সের, বিচারের এমনকি রুচির মেরু প্রমাণ ফারাক সত্ত্বেও তার সাথে [তার ভাষায় সহবৎ] আমার ভালো লাগত এবং যদি ভুল করে না থাকি, তারও।
তখনো তিনি চাকরি করেন। এর মধ্যে শাহনামা প্রকাশিত হয়েছে, আমি উপহারের প্রত্যাশা না করেই কিনেছি, পড়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। শুধু মেধা বা অধিকার নয়, প্রীতিময় আবেগ না থাকলে এ ধরনের শ্রমদান যে সম্ভব নয়, তাও টের পেয়েছিলাম। বইটির ভালো একটা সমালোচনাও হয়নিÑ আর এই প্রচারবিমুখ নিটোল ভদ্রলোকের আত্মমর্যাদাবোধ যে কত বেশি ছিল তা তো আমি জানতাম। আমি মৌখিকভাবে আমার সপ্রশংস মনোভাব ব্যক্ত করলেও শাহনামা সম্পর্কে একটি পঙ্ক্তিও লিখিনি এমনকি পরবর্তীকালে তিনি আমাকে তার কিছু বই উপহার দিয়েছিলেন, সেসব সম্পর্কেও কিছু লিখিনি। অথচ অনুরোধে উপরোধে, চাপে পাড়ে কমও তো লিখিনি। এখন এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করা মানে মন খারাপ করা।
চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরও তিনি মাঝে মধ্যে বাংলা একাডেমিতে আসতেন, প্রথম প্রথম একা, পরে তার ছেলে আনিসকে নিয়ে। আনিস তার বাবার অনেক গুণই পেয়েছেন অন্তত সৌজন্যের ব্যাপারে।
আহা, যদি ফারসি ভাষাটা জানতাম, কিংবা উর্দু যদি কষ্ট করে শিখে ফেলতে পারতাম, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহেবের সাথে চমৎকার আড্ডা মারা যেত। সন্দেহ নেই, আমি নিজে আরো উপকৃত হতে পারতাম।
একটা খটকার কথা বলি। আমার কথা নয়, বলেছিলেন কবি আহসান হাবীব। তিনি বলেছিলেন বেশ আফসোসের ভঙ্গিতেইÑ আমার কবিতার যত ভক্ত ছিলেন, সমালোচক একটিও ছিলেন না। স্মৃতি থেকেই   লেখলাম, তবে বোধহয় খুব একটা ভুল লিখিনি। আমার বাবার কণ্ঠে, আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক খান মোহাম্মদ সালেকের কণ্ঠে আমি আহসান হাবীবের দীর্ঘ কবিতা শুনেছিÑ তাদের কণ্ঠস্থ ছিল। মনিরউদ্দীন ইউসুফের সাহিত্যচর্চার প্রস্তুতি ছিল, তিনি যথেষ্ট সময় এবং শ্রমও দিয়েছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন এবং মেধার স্বাক্ষরও রেখেছেন। ফর্ম নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কিন্তু নিজের সম্ভাবনাকে হয়তো যাচাই করে উঠতে পারেননি এমনকি এ ব্যাপারে সাহিত্য সমালোচকেরা তাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেননি। হয়তো তাকে আহত করতে তাদের সায় ছিল না।
তার সিদ্ধি অনুবাদেÑ বিশেষ করে ফারসি চিরায়ত সাহিত্যের এবং মরমি কবিতার অনুবাদে যা চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে। বুদ্ধদেব বসুর সাথে কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে তার।
আমি বেশ কয়েক বছর দেশের বাইরে ছিলাম। দেশে ফিরে তাকে আর পাইনি। ইংরেজিতে যাকে gentleman বলে, বাংলায় তার অনুবাদ না করে আমি স্রেফ মনিরউদ্দীন ইউসুফের নাম করব। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের তুঙ্গ-অবস্থায় যখন ভালো মানুষের দুর্ভিক্ষই প্রবলতর, সে সময় এমন একটি মানুষকে হারানো শুধু কি কেবল ব্যক্তিগত শোক আর কিছু নয়?
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে