• ...
ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৫৭ মিনিট আগে
ই-পেপার

দশ বছর পর

রু বে ল রা না
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শনিবার, ১০:৪৮
আজ দশ বছর পর মুন্নি আর সোহেল যার যার ভুল স্বীকার করে নতুন করে সংসার শুরু করল। বিয়ের দুই বছর পার হওয়ার পর একটি মেয়েকে নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে দশ বছর আলাদা হয়ে থেকেছে তারা। সোহেল বিয়ের আগে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত, এখনো করছে। আর মুন্নি তখন পড়ালেখা করত অনার্স ফাইনাল ইয়ারে গণিত নিয়ে। মুন্নির পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়ে হয় তাদের। বিয়ের আগে তাদের প্রেমটা হয় বাংলা সিনেমার মতো। রাস্তায় দু’জন ধাক্কা লাগে। যে দিন তাদের মাঝে ধাক্কা লাগে সেই দিন সোহেল তার অফিসে যাওয়ার সময় ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল আর মুন্নিও সেই রাস্তা দিয়েই বিপরীত দিকে যাচ্ছিল। মুন্নির হাতে একটি খাতা ছিল, খাতাটা খুলে দেখে দেখে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে মুন্নি সোহেলের গায়ে ধাক্কা খায়। ধাক্কা খাওয়ার সাথে সাথে সোহেলের মোবাইল সেটটা রাস্তায় পড়ে যায়। পরে মুন্নি সোহেলকে সরি বলে মোবাইল সেটটা রাস্তা থেকে তুলে দিতে উপুড় হয়। সোহেল মুন্নির আগেই নিজের মোবাইল সেটটা তুলে নেয়। মোবাইল সেটের কোনো সমস্যা হয়নি।
এরপর আস্তে আস্তে ফোনে এক দিন-দুই দিন কথা বলতে বলতে ভালো লাগা, ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা অতঃপর বিয়ে। বিয়ের এক বছরের মধ্যে মুন্নি সন্তান নেয়, এতে সোহেলেরও মতো ছিল। তাদের একটি মেয়ে হয়, নাম রাখে দৃপ্তি। দৃপ্তির বয়স যখন এক বছর পূর্ণ হয় তখনই দু’জন আলাদা হয়ে যায়। সোহেলের ছাব্বিশতম জন্মদিনে সকালে তার অফিসের জুনিয়র কর্মচারী একটি মেয়ে রজনীগন্ধা ফুলের তোড়া নিয়ে এসে বাসাতে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। মেয়েটা আসলে সোহেলের প্রতি একটু বেশি খেয়াল রাখে। কারণ হচ্ছে মেয়েটার প্রমোশনের ক্ষমতা সোহেলের হাতে। সোহেল হ্যাঁ বললেই মেয়েটার প্রমোশন হয়ে যায় আর মেয়েটা প্রমোশনের আশায় সোহেলের পেছনে এভাবে লেগে থাকে। এ ছাড়া খারাপ বা অন্য কোনো চিন্তাভাবনা মেয়েটার মাঝে নেই। কিন্তু মুন্নি মানতে পারল না, মেয়েটা কেন এত সাতসকালে সোহেলকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে আসবে? নিশ্চয় মেয়েটার সাথে সোহেলের সম্পর্ক আছে। মেয়েটা সোহেলকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা অফিসে জানালেই হতো, কেন এত বাড়তি ঝামেলা করতে তার বাসাতে গেল? অফিসে তো সবাই সোহেলকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানায়, কই তারা তো কেউ বাসাতে যায়নি? যদিও সোহেল অফিসের স্টাফদের দাওয়াত করে প্রতি বছরেই। কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত বাসাতে যায়নি। নতুন এই মেয়েটা গিয়েছিল। মেয়েটি গেছে ভালো কথা। তাই বলে এত সাতসকালেই কি যেতে হবে? এত সকালে মেয়েটিকে দেখেই তো মুন্নির মনে সন্দেহটা ঢোকেছে। এরপর সেই মেয়েটাকে কেন্দ্র করে মুন্নি সোহেলের সাথে ঝগড়া শুরু করে দেয়। সোহেল মুন্নিকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু মুন্নি কোনো কথায় বোঝার চেষ্টা করে না। অবশেষে একদিন মুন্নি সোহেলকে রেখে দৃপ্তিকে নিয়ে তার বাবার বাসায় চলে যায়। 
মুন্নি যেমন সোহেলকে ডিভোর্স দিচ্ছে না, সোহেলও তেমন মুন্নিকে ডিভোর্স দিচ্ছে না। অন্য কোনো মেয়েকে বিয়েও করছে না। সোহেলের সুখ-দুঃখ, হাসি, আনন্দ, সংসার সবই ছিল মুন্নিকে ঘিরে, মুন্নিই ছিল তার জীবনের প্রথম প্রেম, প্রথম বউ। সোহেল আর দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় না, প্রয়োজনে সারা জীবন এভাবেই থাকবে। এভাবে আরো পাঁচ বছর কেটে যায়। দৃপ্তি বড় হয়, বুঝতে শিখে। একদিন দৃপ্তি তার দাদুর কাছে জানতে চেয়ে বলল, ‘দাদু, আমার মা কিভাবে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে আমাকে একটু বলো না।’ দৃপ্তির আবদারে কথা শুনে দাদু আর কথা গোপন রাখতে পারল না, সত্য কথা বলে দিলো যে, তার মা মারা যায়নি। তার বাবা আর মায়ের মাঝে বিরোধ চলছে। দৃপ্তি দাদুর কাছে সব শুনে ঠিক করল ঢাকা চলে এসে তার মাকে বাবার বাসায় নিয়ে আসবে। নিশ্চয় তার কথা মা শুনবে, বাবাও মানবে। 
এরপর একদিন দৃপ্তি গ্রাম ছেড়ে তার দাদা-দাদীকে ছেড়ে শহরে চলে আসে আবার। শহরে এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়। দৃপ্তি আসার পর মুন্নি একদিন দূর থেকে দৃপ্তিকে দেখে ভাবে এ নতুন মেয়েটি আবার কে এলো সোহেলের বাসায়? আগের কাজের মেয়েটাকে তো সে চেনে। এটা আবার নতুন কোনো কাজের মেয়ে এলো নাকি? 
দৃপ্তি ভাবে দাদা-দাদীর কাছে আজ জানতে হবে তার মা কোথায় থাকে, মা যেহেতু অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়নি তাহলে মাকে দেখতে হবে। বাবার আড়ালে দৃপ্তি তার দাদার কাছে জানতে চাইল তার মা কোথায় থাকে। দাদা তার মায়ের পরিচয় ও ঠিকানা বলে দেয়। দাদার মুখে মায়ের পরিচয় শোনার পর দৃপ্তির চোখে পানি চলে আসে। এত দিন ধরে অপরিচিত যে মহিলাকে আন্টি বলে ডাকছে সেই মহিলাই হচ্ছে তার নিজের গর্ভধারিণী মা। বাবার আড়ালে আন্টি সেজে তার সাথে মাঝে মধ্যে দেখা করতে আসে। আজই মা-বাবাকে দাদা-দাদীর সামনে এক করবে দৃপ্তি। দৃপ্তি তাদের বাসার কাজে মেয়ে মনিকাকে দিয়ে খবর পাঠাল তার মাকে এই বাসায় আসার জন্য।
মনিকা মুন্নিকে খবর দেয়ার পর মুন্নি মনিকার কাছে জানতে চাইল দৃপ্তির বাবা বাসায় আছে কি না? আসলে এই সময়ে দৃপ্তির বাবার অফিস থাকে না তাই মুন্নি জানতে চাইল, যদি আবার সোহেল বাসায় থাকে। মনিকাকে দৃপ্তি কথা শিখিয়ে দিয়ে বলেছে যে, মা যদি বাবার কথা জানতে চায় তাহলে বলবে বাবা বাসায় নেই। মনিকা তাই বলে মুন্নির কাছে। নিজের মেয়ে খবর পাঠিয়েছে, না গিয়ে কী পারা যায়? হই না কেন মেয়ের কাছে আন্টি পরিচয় হিসেবে। কিন্তু আমি তো তার মা। মনে মনে বলে মুন্নি।
মনিকার সাথে দৃপ্তিদের বাসাতে ঢোকেই মুন্নি ‘থ’ হয়ে যায় সোহেলকে দেখে। শুধু সোহেল নয়, তার শ্বশুর-শাশুড়িও আছেন বাসায়। মুন্নি দাঁড়ানো থাকাবস্থায় দৃপ্তি দৌড়ে এসে মুন্নিকে জড়িয়ে ধরে মা, মা, মা... বলে কান্না করতে লাগল। এমন কারবার দেখে সোহেলও ‘থ’ হয়ে গেল। দৃপ্তির কান্না দেখে মুন্নিও দৃপ্তিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে আর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে থাকে। এমন দৃশ্যে বাসার সবার চোখে পানি। পরে দৃপ্তি তার মাকে বললÑ মা, আমি সব জেনে ফেলেছি। আমি চাই না আর তোমরা এভাবে থাকো। কত দিন আমি তোমার আদর থেকে বঞ্চিত থেকেছি...।
বলতে বলতে দৃপ্তি তার মাকে হাত ধরে টেনে তার বাবার কাছে নিয়ে যায়। সোহেল সোফায় বসা ছিল। মুন্নিকে দৃপ্তি সোহেলের কাছে আনার পর সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সোহেল। এখন মুন্নি আর সোহেল দু’জন দু’জনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু দু’জনের চোখে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মুন্নির ঠোঁট কাঁপছে, মুখে কথা এসেও যেন থেমে যাচ্ছে। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে মুন্নিই সাহস করে সোহেলের হাতে ধরে বলে, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও।’
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে