• ...
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ মে ২০১৭ | শেষ আপডেট ৩৮ মিনিট আগে
ই-পেপার
এখনো চিকিৎসাধীন ৫৯, আইসিইউতে ৭

বাবার বীভৎস চেহারায় আঁতকে ওঠে ছোট্ট মীম!

শহিদুল ইসলাম রাজী
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, শনিবার, ১২:৩১
বাসের হেলপার বাপ্পি। কাজ করেন আলিফ পরিবহনের একটি বাসে। প্রতিদিনের মতো সকালে ছোট দুই মেয়েকে স্নেহের পরশ বুলিয়ে জীবিকার সন্ধ্যানে বের হয়েছিলেন বাসা থেকে। দিনটি তার ভালোই যাচ্ছিল। রাতে বাসায় ফেরার পথেই বাধে বিপত্তি। বাসটিকে লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে কে বা কারা। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে গাড়িটি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনে পুড়ে যায় বাপ্পিসহ ওই বাসের আরো দুই যাত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর বনশ্রীতে গত বৃহস্পতিবার রাতে। বাসায় ফেরা হয়নি বাপ্পির। দগ্ধ বাপ্পি ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।
গতকাল সকালে মুমূর্ষু বাবাকে দেখতে বার্ন ইউনিটে আসে বাপ্পির দুই মেয়ে ৫ বছর বয়সী পিংকি ও দেড় বছরের মীম। সাথে তাদের মা রিনা বেগমসহ পরিবারের অনেকে। কিন্তু পিংকি বাবাকে দেখে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলেও মীম বাবার কাছে যেতেই আঁতকে ওঠে। কিছুতেই যেতে চাচ্ছে না বাবার কাছে। শিশুটি চিনতে পারছে না বাবাকে। প্রিয় বাবাকে ভয় পাচ্ছে মীম! তার বাবার সারা শরীরে শুধু ব্যান্ডেজ মোড়ানো। বীভৎস চেহারা। বাবাকে চেনার কোনো উপায় নেই।
ছোট মীমের মতো পরিবারের সবাই হতভম্ব হয়ে যান বাপ্পির অবস্থা দেখে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনম মানুষটির এমন পরিণতিতে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ নেমে এসেছে তাদের মাঝে। শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া বাসের হেলপার বাপ্পির অবস্থা সঙ্কটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাই বাপ্পিকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় তারা। শুধু বাপ্পির স্বজনেরাই নয়, একইভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আরো অনেক দগ্ধ রোগীর স্বজনেরা। প্রত্যেকেরই রয়েছে বাপ্পির মতো এক-একটি দুঃস্বপ্নের গল্প।
বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা: পার্থ শংকর পাল জানান, চলমান অবরোধে পেট্রলবোমায় দগ্ধ ১৩২ জন বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৯ জন। দগ্ধদের মধ্যে অনেকেরই মুখমণ্ডল ও হাত পুড়ে গেছে। এদের মধ্যে ৭ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়েছে আরো ৮ জনকে। বাপ্পি সম্পর্কে তিনি বলেন, বাপ্পির শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার অবস্থা শঙ্কটাপন্ন। তার সম্পর্কে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বাপ্পির বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থানার হাবৈ গ্রামে। বাবার নাম দুলাল মিয়া এবং মায়ের নাম হালিমা বেগম। মিরপুর-১ নম্বরের হরিরামপুরে থাকেন তিনি।
বাপ্পির মা হালিমা বেগম জানান, বাপ্পির ছোট সময়ে তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এর পর থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি ছেড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ছেলে বাপ্পি সংসারের হাল ধরেন। এরই মধ্যে ছেলেকে বিয়ে করান। বাপ্পির একমাত্র বোনকেও বিয়ে দিয়েছেন তিনি। মাসে ৩ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিতেন। প্রতিদিন ভোর ৫-৬টার দিকে বাপ্পি বাসা থেকে বের হতেন এবং রাত ১০-১১টায় বাসায় ফিরতেন। এমন কঠোর পরিশ্রম করেও পরিবারের হাল ছাড়েননি বাপ্পি। তাদের সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ বাসে আগুনে ছন্দপতন ঘটেছে সেই সুখের সংসারে।
তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার সুন্দর ছেলের কী হলো। তাকে দেখে চেনা যাচ্ছে না। বাবার বীভৎস চেহারা দেখে বড় মেয়ে পিংকি আঁতকে উঠছে। বাবার কাছে যেতে চাইছে না। আর ছোট মেয়ে মীমকে বারবার দেখতে চান বাপ্পি। কিন্তু বাপ্পি তাকে কোলে তুলতে পারছেন না। বাপ্পিকে দেখতে আসা দুই মেয়ে, স্ত্রী, মা ও কাছের বেশ কয়েকজন স্বজনের কান্নায় বার্ন ইউনিটের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। অনেক রোগীর স্বজনেরাও তাদের সাথে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বাপ্পির মামা আলাই মিয়া বলেন, বাপ্পি আইসিইউতে ভর্তি। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না। আমার বোন ও তার দুটি সন্তান খুবই দুঃখী। তাদের মতো পরিবারের লোকজনকে কেন এই সহিংসতার বলী হতে হবে? সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা নিরীহ মানুষকে বাঁচান, বাঁচতে দিন। এ সময় তিনি সরকারকে দেশের চলমান পরিস্থিতি গণতান্ত্রিকভাবে সমাধান করার অনুরোধ জানান।
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

নগর মহানগর -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে