• ...
ঢাকা, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ৩৮ মিনিট আগে
ই-পেপার

মন রাঙাতে বইমেলা

সুহৃদ আকবর
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, রবিবার, ৯:২২
আবার এলো বইমেলা। মন রাঙাতে এলো বইমেলা। শুরু হলো আমাদের ঐতিহ্যের মেলা। বইমেলা আমাদের উচ্ছ্বাসের, আমাদের প্রাণের, আমাদের পুলকের, আমাদের ভালোবাসার। বইমেলার সাথে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের নির্যাস মিশে আছে। বইমেলার প্রতিটি অক্ষরের সাথে আমাদের একুশের শহীদদের রক্ত মিশে আছে। বইমেলার বইয়ের মলাটের সাথে শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরের বুলেটবিদ্ধ জামার স্মৃতিচিহ্ন লেগে আছে। আর সেই ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বইমেলা। আমাদের দেশের কিছু লেখক-প্রকাশকের যুগ-যুগান্তরের চেষ্টাসাধনার ফল আজকের এই বইমেলা। সেই মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহার স্মৃতিবিজড়িত বইমেলা। একুশের অম্লান স্মৃতিস্মারক এই বইমেলা। বইমেলা আমাদের জাতিসত্তার এত বেশি অংশজুড়ে দখল করে আছে যে একে অস্বীকার করার কোনোই সুযোগ নেই। বর্তমানে বইমেলা আমাদের চেতনার জানালায় পরিণত হয়েছে।
একুশের বইমেলা নিতান্ততই বইমেলা নয়। এটি একাধারে লেখক-পাঠক আর দর্শকদের মিলনমেলা। এ মেলায় মেধা আর মননের অপরূপ এক সম্মিলন ঘটে। দেশের বইপ্রেমী রুচিশীল, সুপণ্ডিত, স্বশিক্ষিত, পরিমার্জিত, উচ্চমাপের ভদ্রপরিবার সর্বোপরি সব সৃষ্টিশীল মানুষের প্রাণের সমাবেশ এটি। বইপ্রেমী মানুষ সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন কখন বইমেলা শুরু হবে তার জন্য। ভক্ত পাঠককুল বুকভরা আবেগ আর প্রাণভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে ছুটে আসেন এ বইমেলা প্রাঙ্গণে। বইয়ের ঘ্রাণে বইমেলায় ছুটে যায় বইপ্রেমী মানুষ, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, স্বামী-স্ত্রী, নবদম্পতি।
বইপ্রেমী মানুষ বুকভরা আশা, প্রাণভরা চাওয়া, চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে এ বইমেলায় হাজির হয়। তারা বইমেলায় এসে নতুন বই নেড়েচেড়ে দেখে, নাক দিয়ে বইয়ের গন্ধ শুঁকে, চোখ ভরে অনিন্দ্য সুন্দর কারুকার্যময়ী বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে তাদের মন ভরিয়ে তোলে। বইয়ের সৌন্দর্যে পাগলপারা হয় তাদের মন। তাই তো বন্যার পানির মতো এত মানুষ দলবেঁধে বইমেলায় আসে। তারা প্রিয় লেখকের বই কেনে। প্রিয় মানুষের জন্য বই কেনে। বইয়ের পৃষ্ঠায় লেখকের অটোগ্রাফ নেয়। লেখকের সাথে ছবি তোলে। এ যেন ভিন্ন এক অনুভূতি, অপরূপ প্রাণে পুলক লাগানো অপরূপ এক পরিবেশ।
বইমেলার সময় বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণজুড়ে কেবলই প্রাণের ছড়াছড়ি থাকে। বেজে ওঠে উচ্ছ্বাসের সুর। বইমেলা বইপ্রেমী মানুষের আবেগ-অনুভূতি আর শিহরণের মাত্রাকে বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। বইমেলার মূল মঞ্চ থেকে শুরু করে লেখক কুঞ্জ, মিডিয়া কর্নার, নজরুল মঞ্চ সর্বত্রই কেবল মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। নজরুল ইনস্টিটিউটের স্টলে নজরুলপ্রেমী, নজরুল সাহিত্যামোদী মানুষের ব্যাপক ভিড় পরিলক্ষিত হয়।
১ ফেব্রুয়ারি এ মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সর্বসাধারণের জন্য এ মেলার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। মাসব্যাপী প্রতিদিন এ মেলা বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলছে। মেলায় কোনো প্রবেশমূল্য ধরা হয়নি।
মেলায় স্টল বরাদ্দ পেতে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে এক বছরে অন্যূন ২৫টি নতুন বই প্রকাশ করতে হয়। যদিও বোদ্ধা মহলসহ অনেকেই এটিকে একধরনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা বলে মনে করেন। তাদের মতে, সংখ্যা নয়, মানসম্পন্ন বইকেই গুরুত্ব দেয়া উচিত।
মেলায় বই প্রকাশের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালার প্রয়োজন পড়ে না। মেলাকে একটি সুনির্দিষ্ট সুশৃঙ্খলিত পরিমার্জিত রূপ দেয়ার জন্য বইমেলায় বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। তবে তা যেন লেখকবান্ধব নীতিমালা হয়। কেননা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে লেখকেরাই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, অধিকারবঞ্চিত। তাদের ভাগ্যে শুধু বাহবা-ই জোটে, পেটে ভাত জোটার জন্য অর্থ জোটে ক’জন লেখকের ভাগ্যে? তাই লেখকদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা করার জন্য সরকার একটা নীতিমালা করতে পারে, যাতে লেখকেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
একুশের বইমেলায় প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন বই বের হয়। হিসাব করলে মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা খুব একটা বেশি দেখা যায় না। লেখকেরা জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বটে; তবে একটা কথা স্মরণে রাখতে হবে যে, দূরদর্শী, নৈতিক, প্রাজ্ঞ, মননশীল এবং প্রকৃত গভীর চেতনার লেখক যারা, তারাই জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কলমসৈনিক। এমন জাত-স্বভাবী লেখকেরাই জাতির চেহারা পাল্টাতে পারবেন। লেখক হওয়া কোনো চাট্টিখানি কথা নয়; যারা লেখক হওয়াকে ফ্যাশনের ব্যাপার বলে মনে করেন, তারা প্রকৃত লেখক নন। যাদের মনে, মননে, অস্থিমজ্জার মধ্যে যাদের লেখক-সত্তা আছে তারাই আসল লেখক। প্রকৃত লেখকের ধ্যানজ্ঞান হচ্ছে কেবলই লেখালিখি করা। যখন যেখানে যে অবস্থায় তিনি থাকেন সার্বক্ষণিকভাবে লেখালেখির চিন্তায়ই নিমগ্ন থাকেন তিনি। সমাজের অন্যায়-অনাচার, জাতির বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য তারা লেখেন। এ ক্ষেত্রে কোনো নগদ প্রাপ্তি তারা প্রত্যাশা করেন না।
বাংলাদেশী জাতির ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি, জ্ঞানবত্তা, বিজ্ঞান ও সাহিত্য চেতনা যে কত বেশি প্রখর তা একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমাদের চোখে পড়ে। একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে তা দেশ থেকে দেশে মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের তথ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে বলে বইমেলায় আগত পাঠক এবং প্রকাশকেরা মনে করেন।
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
suredakbar@gmail.com
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

ফিচার -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে