• ...
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | শেষ আপডেট ০৯ মিনিট আগে
ই-পেপার

রাজনীতিক জিয়াউর রহমান

প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামান
১৯ জানুয়ারি ২০১৫, সোমবার, ৯:১৪
জিয়াউর রহমানের সাথে আমার মোটামুটি পরিচয় ছিল। তার সাথে প্রথম পরিচয়ের, তার ছয় মাস পর আমি অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাই। একদিন অস্ট্রেলিয়ায় তদানীন্তন হাইকমিশনার এ এইচ খন্দকারের বাসায় দুপুরের খাবারের জন্য আমন্ত্রিত হই। খাবার টেবিলে যখন বসেছি, এমন সময় মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার জেনারেল শফিউল্লাহ টেলিফোনে এ এইচ খন্দকারকে জানালেন জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছেন। আমাদের আর দুপুরের খাওয়া হলো না। দুজনের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কিছু দিন আগে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির তদানীন্তন ভাইস চেয়ারম্যান কাজী গোলাম মাহবুবের মারফতে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আমাকে অস্ট্রেলিয়া না গিয়ে দেশে থেকে দেশের জন্য কাজ করতে বললেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুসংবাদ শুনে মনে হলো, তিনি মারা যাবেন বলেই হয়তো আমাকে দেশে থাকার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন। 
জিয়াউর রহমানের সাথে আলাপ-আলোচনার সময় প্রায়ই দুটো কথা বলতেনÑ ‘পলিটিকস শুড বি মেট বাই পলিটিকস, ফায়ার পাওয়ার বাই ফায়ার পাওয়ার।’ রাজনীতির মোকাবেলা করতে হবে রাজনীতি দিয়ে, আর অস্ত্রের মোকাবেলা করতে হবে অস্ত্র দিয়ে। তিনি আরেকটি কথা বলতেন, ‘পিপলস আর দ্য সোর্স অব অল পাওয়ার্স’ অর্থাৎ জনগণই সব শক্তির উৎস। এই দু’টি কথার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চরিত্র ফুটে ওঠে। 
রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলার সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র হলো রাজনৈতিক দল। আর রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো জনগণের ব্যাপক সমর্থন অর্জন করা। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর অন্য সামরিক শাসকের মতো অস্ত্র দিয়ে দেশ শাসন করার সুযোগ নেননি। তিনি সামরিক বাহিনীর ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার নীতি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছেন। তিনি জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতা লাভের পর একজন রাজনীতিক আমার বাসায় আসেন। তিনি জানান, জিয়াউর রহমান বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন চান। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে তার কাছে নিয়ে আসার জন্য। তিনি তাদের সাথে দেশের সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে বুদ্ধিজীবীদের সাথে দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনা করেন। 
রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ হলো রাজনৈতিক দল গঠন। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতার ক্ষমতায় আরোহণের মূল সিঁড়ি হলো তার পরিচালিত রাজনৈতিক দল। আমরা সবাই জানি, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একজন রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারেন। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, রাজনৈতিক শক্তির মূল উৎস জনগণের সমর্থন। জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য রাজনৈতিক দল গঠন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। 
নিজের ক্ষমতাকে সংগঠিত করার জন্য জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া চালু করেন। একটি দেশে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার লোক বাস করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, বড় রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য একজন রাজনৈতিক নেতাকে ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়া চালু করতে হয়। এই ঐক্য গঠনের প্রথম স্তর হিসেবে জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করেন। এই দলের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও চিন্তা-চেতনার লোকজনকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আসেন। ভিন্নমতের লোকদের একত্র করা ছিল জিয়াউর রহমানের একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য। 
এই সাফল্য ধরে রাখতে এই লোকদের সঙ্ঘবদ্ধ রাখার জন্য একটি রাজনৈতিক দর্শন দরকার ছিল। এই রাজনৈতিক দর্শন হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। আমি জানি না কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা বুদ্ধিজীবী তাকে এই রাজনৈতিক দর্শন তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন কি না। আমার ধারণা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ জিয়াউর রহমানের নিজস্ব মৌলিক চিন্তাধারা থেকে উৎসারিত। 
তিনি যেমন ভূখণ্ডগত ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেখতে চেয়েছিলেন, তেমনি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন একটি স্বাধীন দেশের জাতীয়তাবাদী মতবাদ মানুষের ধর্ম, ঐতিহ্য ও চেতনা থেকে উৎসারিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ভাষা ও ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্বে ধর্মীয় মূল্যবোধের কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, ইসলাম ধর্ম ও ইসলামি মূল্যবোধ ছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অস¤পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সব ধর্মের স্বাধীনতা ও সমমর্যাদা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এবং জাতীয়তাবাদকে সুসংহত করবে। 
একজন রাজনীতিক হিসেবে জিয়াউর রহমানের শ্রেষ্ঠ গুণ হলো দেশের মনকে বুঝতে পারা। দেশের মানুষের ধর্মীয় স্বতন্ত্র সত্তার পরিচয় খুঁজে পাওয়া। বাংলাদেশের মানুষের মনকে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই জিয়াউর রহমান শাসনতন্ত্রের শুরুতে বিসমিল্লাহ সংযুক্ত করেছিলেন। এ সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশের মানুষের অন্তরের প্রতিফলন। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র বারবার সংশোধন হয়েছে এবং হবে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে চাইলে শাসনতন্ত্র থেকে বিসমিল্লাহ বাদ দিতে পারবে না। শাসনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ যোগ করে জিয়াউর রহমান অমর হয়ে রয়েছেন। 
মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দল সৃষ্টির জন্য একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দর্শনই যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার একজন সুদক্ষ সংগঠক। জিয়াউর রহমান তার অল্প দিনের শাসনামলে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। জনগণের সমর্থনের জন্য তার খাল খননকার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছার চেষ্টা করেন। নিজে শত শত মাইল হেঁটেছেন। সাধারণ মানুষের সাথে হাত মিলিয়েছেন। উপমহাদেশের রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ও আমেরিকান কূটনীতিক ক্রেগ বাস্টার বলেছেন,  শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পর আর কোনো রাজনীতিক জিয়াউর রহমানের মতো কৃষিশ্রমিকদের সাথে বেশি মেশেননি।  এভাবে বিপুল কর্মযজ্ঞের ফলে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী ও নারীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী দল ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। 
পাঁচ বছরের শাসনামলে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী দলকে বাংলাদেশের দু’টি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের একটিতে পরিণত করে। জাতীয়তাবাদী দল গঠন করে তিনি বাংলাদেশে দ্বিদলীয় ব্যবস্থার রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, দ্বিদলব্যবস্থা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী দলকে এমন সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে যান যে, তার মৃত্যুর পরও বাংলাদেশ সৃষ্টিকারী দল আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে দুবার সরকার গঠন করে। 
আমার ধারণা, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় যে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা আছে, বাংলাদেশেও এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা টিকে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে তোলার কৃতিত্ব যেমন মওলানা ভাসানীকে দেয়া যায়, তেমনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। 
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী
পাঠকের মতামত
আপনার মতামত
নাম
ই-মেইল
মতামত
CAPTCHA Image

বিশেষ আয়োজন -এর অন্যান্য সংবাদ
উপরে